শনিবার, ২৮শে মার্চ ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৩ই চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ৫ আগস্টের আগে ও পরে পুলিশ হত্যার বিচার হবে: আইজিপি *** শরীয়তপুরে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে অগ্নিসংযোগ *** ঝিনাইদহে স্বাধীনতা দিবসে ইউএনওর বক্তব্যে বিএনপির ক্ষোভ, ভিডিও ভাইরাল *** মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের সবচেয়ে গৌরবজনক অর্জন, এর সঙ্গে অন্য ঘটনা মেলানোর সুযোগ নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী *** স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তিকে রুখে দিতে হবে, কোনোভাবেই ছাড় হবে না: মির্জা ফখরুল *** আলোচনার নামে এমন কিছু করা উচিত নয়, যা মুক্তিযুদ্ধকে খাটো করে: প্রধানমন্ত্রী *** ড. ইউনূস ২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকতে পারেননি কেন? *** সরকার এপ্রিল পর্যন্ত জ্বালানি নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে: জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী *** তেল সরবরাহ স্বাভাবিক, তবে কালোবাজারির প্রভাব আছে: জ্বালানিমন্ত্রী *** ‘বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে’

স্ত্রীকে ধর্ষণ শেখান স্বামীরা, সিএনএনের অনুসন্ধান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

🕒 প্রকাশ: ০৬:০১ অপরাহ্ন, ২৭শে মার্চ ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

২০২৪ সালে ফ্রান্সে নিজ স্ত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের দায়ে ডমিনিক পেলিকট ও তার ৫০ জন সহযোগীর বিচারের ঘটনা বিশ্ববাসীকে প্রথমবার ইন্টারনেটে যৌন নির্যাতনকারী এক ঘৃণ্য চক্রের মুখোমুখি করেছিল। ডমিনিক তার স্ত্রী জিসেল পেলিকটকে মাদক খাইয়ে অচেতন করে ১০ বছর ধরে প্রায় ৭০ জন অপরিচিত পুরুষকে দিয়ে ২০০ বারের বেশি ধর্ষণ করিয়েছিলেন।

এই জঘন্য অপরাধের পরিকল্পনা করা হয়েছিল ‘উইদাউট হার নলেজ’ নামের একটি অনলাইন চ্যাটরুমে।

পেলিকট মামলার পর সেই ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেওয়া হলেও মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের দীর্ঘ কয়েক মাসের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে আরেকটি অন্ধকার জগৎ, যেখানে নারীদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা ব্যাপকভাবে বাড়ছে। একে বলা হচ্ছে একটি অনলাইন ‘রেপ একাডেমি’ বা ধর্ষণের পাঠশালা।

সিএনএনের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ‘মাদারলেস ডটকম’ নামের একটি পর্নোগ্রাফি সাইটে ২০ হাজারের বেশি ভিডিও রয়েছে, যেগুলোকে ‘স্লিপ কনটেন্ট’ বা ঘুমন্ত অবস্থায় ধারণ করা কনটেন্ট বলা হয়। সাইটটি নিজেকে ‘আইনিভাবে বৈধ সবকিছুর হোস্ট’ হিসেবে দাবি করলেও সেখানে থাকা কনটেন্টগুলোর বৈধতা নিয়ে চরম সংশয় রয়েছে। এখানে #passedout (অচেতন) এবং #eyecheck নামের ট্যাগ ব্যবহার করে ভিডিও আপলোড করা হয়।

এই ‘আইচেক’ ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, পুরুষেরা তাদের স্ত্রী বা সঙ্গিনীর বন্ধ চোখের পাতা টেনে তুলে দেখাচ্ছেন যে—তারা গভীরভাবে ঘুমে বা মাদকের প্রভাবে অচেতন আছে কি না। টেলিগ্রামের ‘জেডজেডজেড’ (Zzz) নামের চ্যাট গ্রুপে পুরুষেরা একে অপরকে পরামর্শ দেন—কীভাবে সঙ্গিনীকে মাদক খাইয়ে অচেতন করা যায় এবং কোন ওষুধের ডোজ কতটুকু হবে। ওই গ্রুপের সঙ্গে ‘মাদারলেস’ পর্নো সাইটের সংযোগও পেয়েছে সিএনএন।

সিএনএন পিওতর (Piotr) নামের এক ব্যবহারকারীর সঙ্গে কথা বলেছে। তিনি পোল্যান্ডে নিজের স্ত্রীকে মাদক খাইয়ে নির্যাতনের ছবি ও ভিডিও ওই গ্রুপে শেয়ার করতেন। সিএনএন ছদ্মবেশে পিওতরের সঙ্গে যোগাযোগ করে তার পরিচয় নিশ্চিত করতে পোল্যান্ডে তার এলাকায় যায়।

সেখানে দেখা যায়, পিওতর তার স্ত্রীর সঙ্গে একটি রেস্তোরাঁয় খাচ্ছেন, অথচ সেই নারী টেরই পাচ্ছেন না যে তার স্বামী ইন্টারনেটের একদল নরপশুর কাছে তাকে প্রতিনিয়ত পণ্য হিসেবে বিক্রি করছেন।

এই অনলাইন গ্রুপগুলোতে ভিডিওই হচ্ছে আসল আকর্ষণের বস্তু। অনেক পুরুষ তাদের স্ত্রীকে মাদক খাইয়ে অচেতন করার পর সেই দৃশ্য লাইভ স্ট্রিমিং বা সরাসরি সম্প্রচার করেন এবং প্রতি দর্শকের কাছ থেকে ২০ ডলার করে ফি নেন। এই অর্থ লেনদেনের জন্য ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করা হয়, যাতে পরিচয় গোপন থাকে। এমনকি স্পেনের একটি এলাকা থেকে এক ব্যক্তি দাবি করেছেন যে, তিনি সারা বিশ্বে এমন এক ‘স্লিপিং লিকুইড’ বা ঘুমের তরল সরবরাহ করেন, যা স্বাদহীন ও গন্ধহীন। তাঁর দাবি, ‘আপনার স্ত্রী কিছুই বুঝতে পারবেন না এবং পরে কিছু মনেও রাখতে পারবেন না।’

জো ওয়াটস নামের এক ব্রিটিশ নারী ১৬ বছর সংসার করার পর জানতে পারেন, তার স্বামী তাদের ছেলের ঘুমের ওষুধ তার চায়ের সঙ্গে মিশিয়ে দিতেন এবং অচেতন অবস্থায় তাকে দিনের পর দিন ধর্ষণ করতেন।

জো বলেন, ‘আমরা রাতে একা রাস্তায় হাঁটতে ভয় পাই, অপরিচিত কারও সঙ্গে ফেসবুক বন্ধু হতে ভয় পাই। কিন্তু পাশের মানুষটির ওপর যে আমাদের বিশ্বাস, তা যে এত ভয়ংকর হতে পারে, আমি বুঝিনি।’

২০১৮ সালে একদিন গির্জা থেকে ফেরার পর তার স্বামী নিজেই এক দিনের কেনাকাটার তালিকার মতো করে নিজের অপরাধের কথা স্বীকার করেন। জোর স্বামী এখন ১১ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন।

আরেকজন ভুক্তভোগী আমান্ডা স্ট্যানহোপ জানান, পাঁচ বছর ধরে তিনি মাঝে মাঝে হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়তেন এবং সকালে শরীরে কালশিটে দাগ নিয়ে জেগে উঠতেন। তার স্বামী তাকে ‘পাগল’ বলে উড়িয়ে দিতেন। ফ্রান্সের জিসেল পেলিকটের সাহস দেখে আমান্ডাও পুলিশের দ্বারস্থ হন।

তখন তার স্বামী বিচারের আগেই আত্মহত্যা করেন। আমান্ডা আক্ষেপ করে বলেন, ‘পুলিশকে যখন আমি আমার অচেতন অবস্থার ভিডিও দেখালাম, তারা বলেছিল যে, দেখে মনে হচ্ছে, আমি ঘুমের অভিনয় করছি। অর্থাৎ প্রমাণ থাকার পরেও আমাদের বিশ্বাস করা হয় না।’

ইতালির ভ্যালেন্টিনা (ছদ্মনাম) ২০ বছর সংসার করার পর স্বামীর কম্পিউটারে নিজের ওপর চলা যৌন নির্যাতনের ভিডিও খুঁজে পান। তিনি বলেন, ‘আমি নিজেকে এখন কসাইখানার এক টুকরা মাংস মনে করি।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলধারার পর্নো সাইটগুলোতে এ ধরনের কনটেন্টের অবাধ ছড়াছড়ি যৌন সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে তুলছে। ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিশেষজ্ঞ ক্লেয়ার ম্যাকগ্লিন বলেন, সরকার এই অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে অনীহা দেখাচ্ছে বলেই এই অপরাধ বাড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্রে ‘সেফ হারবার’ আইনের কারণে মাদারলেসের মতো সাইটগুলো ব্যবহারকারীদের আপলোড করা কনটেন্টের জন্য সরাসরি দায়বদ্ধ থাকে না। ফলে পেলিকট বা পিওতরের মতো পুরুষেরা অনায়াসেই এই প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহার করে ধর্ষণের কৌশল শিখছেন এবং একে অপরের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলছেন। ফরাসি সংসদ সদস্য স্যান্ডরিন জোসো এই গ্রুপগুলোকে ‘স্কুল অব ভায়োলেন্স’ বা সহিংসতার পাঠশালা হিসেবে অভিহিত করেছেন।

ড্রাগ ফেসিলিটেটেড সেক্সুয়াল অ্যাসল্ট (ডিএফএসএ) বা মাদক প্রয়োগের মাধ্যমে যৌন নির্যাতনের প্রকৃত মাত্রা কতটুকু, তা বোঝা কঠিন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, এ ধরনের অপরাধের কোনো সঠিক তথ্য নেই, কারণ, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা লজ্জায় বা ঘটনার স্মৃতি মনে না থাকায় অভিযোগ করেন না। এ ছাড়া হাসপাতাল ও পুলিশের প্রশিক্ষণের অভাবেও অনেক ভুক্তভোগী সঠিক সহায়তা পান না।

ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত এক দশকে অচেতন অবস্থায় যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার হার ২১ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

পেলিকট মামলার পর জিসেল বলেছিলেন, লজ্জার ভার এখন পরিবর্তন করতে হবে। অর্থাৎ লজ্জা ভুক্তভোগীর নয়, বরং অপরাধীর হওয়া উচিত। কিন্তু অনলাইন রেপ একাডেমিগুলো যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, তাতে ঘরে ও বাইরে নারীদের নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে।

সিএনএনের এই অনুসন্ধান প্রমাণ করে, ডমিনিক পেলিকট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিলেন না; বরং ইন্টারনেটের অন্ধকার জগতে এমন হাজারো পেলিকট প্রতিদিন তাদের কাছের মানুষদের দ্বারা চরম নৃশংসতার শিকার হচ্ছেন।

ধর্ষণ

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250