ছবি: সংগৃহীত
সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেছেন, তিনি সেনাপ্রধানের দায়িত্বে থাকার সময় জানতে পারেন—সেনাবাহিনীর জুনিয়র অফিসারদের মিসগাইড করা হচ্ছে এবং ভুল পথে পরিচালিত করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে তিনি তিনটি ঘটনা উল্লেখ করেন।
এরমধ্যে একজন কনিষ্ঠ কর্মকর্তা র্যাব থেকে প্রত্যাবর্তনের পর তাকে জানান, তিনি ৬ জনকে হত্যা করেছেন। যার মধ্যে দুজনকে তিনি সরাসরি হত্যা করেছেন এবং ৪ জনকে হত্যার সময় উপস্থিত ছিলেন। তাদের হত্যার জন্য ১০ হাজার টাকা করে পেয়েছিলেন ওই কর্মকর্তা। আর সেই টাকা গ্রামের মসজিদে দান করেছিলেন। ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করে অপরাধবোধ থেকে টাকাগুলো মসজিদে দান করেছেন বলে মনে করেন ইকবাল করিম ভূঁইয়া।
আজ সোমবার (৯ই ফেব্রুয়ারি) গুম-খুনের ঘটনায় ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (বরখাস্ত) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার জবানবন্দিতে এসব কথা বলেন সাবেক সেনাপ্রধান। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ১-এ এই জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়।
ইকবাল করিম ভূঁইয়া আরও বলেন, তিনি শুনেছেন—র্যাব যাদের হত্যা করত তাদের পেট চিড়ে নাড়িভুড়ি বের করে ইট–পাথর বেঁধে নদীতে ডুবিয়ে দিত। র্যাবের এসব কর্মকাণ্ড দেখে তিনি বিভিন্ন ডিভিশন এবং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ভিজিট করতে থাকেন। অফিসারদের এসব কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে মোটিভেট করতে শুরু করেন।
তিনি বলেন, একপর্যায়ে সেনাবাহিনীর যত কমান্ডিং অফিসার আছেন তাদের ঢাকায় এনে জুনিয়র অফিসারদের প্রতি তাদের কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করেন। তাদের স্মরণ করিয়ে দেন—শেখ মুজিবুর রহমান এবং জিয়াউর রহমান হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে অনেক অফিসারের ফাঁসি হয়েছে। দশ ট্রাক অস্ত্র মামলায় আরও কিছু সামরিক অফিসার ফাঁসির দন্ড মাথায় নিয়ে হাজতবাস করছেন।
তিনি বলেন, এতকিছুর পরও যখন বুঝতে পারেন ক্রসফায়ার থামছে না, তখন তিনি ডিজিএফআই, বিজিবি এবং র্যাব থেকে অফিসার ফেরত নেওয়া এবং পোস্টিং করা বন্ধ করে দেন। তখন অনেকে তাকে মনে করিয়ে দেন, তিনি যা করছেন তা বিদ্রোহের শামিল।
সাবেক সেনাপ্রধান আরও বলেন, পোস্টিং বন্ধ করার প্রতিক্রিয়াও ছিল মারাত্মক। তিনি প্রতিনিয়ত অফিসার পোস্টিং করার জন্য এমএসপিএমের কাছ থেকে টেলিফোন পেতে থাকেন। একসময় র্যাবের ডিজি (পরে আইজিপি) বেনজির আহমেদ তার অফিসে আসেন এবং র্যাবে অফিসার দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানান।
তিনি বলেন, চট্টগ্রামে হোটেল র্যাডিসন উদ্বোধনের সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুলিশের সঙ্গে বৈঠকের সময় তাকে ডেকে নেন এবং র্যাবে অফিসার দিতে বলেন। অফিসারের স্বল্পতার কারণে র্যাবে অফিসার দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানালে তার অবসর গ্রহণের আগে পর্যন্ত এই চাপ অব্যাহত ছিল। কিন্তু তিনি সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন বলে জানান ইকবাল করিম।
সেনাবাহিনী সম্পর্কে এসব কথা বলার কারণ হিসেবে সাবেক সেনাপ্রধান বলেন, র্যাবের কর্মকাণ্ডের কারেণ তার দায়িত্বের সময়টি ছিল অত্যন্ত কষ্টদায়ক। কিছু না করতে পারার বেদনা তাকে সবসময় আচ্ছন্ন করে রাখত। এখন সুযোগ এসেছে সেই করতে না পারা কাজটি সম্পন্ন করার।
সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া আরও বলেন, তিনি সেনাপ্রধানের দায়িত্বে থাকার সময় জানতে পারেন—মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দীকির ছত্রচ্ছায়ার ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’—এর কিছু ব্যক্তি নিয়মিত ডিজিএফআইয়ের অফিস ভিজিট করত। সেখানে যে ৭টি মিটিং রুম ছিল তার একটিতে তাদের কাজ করতে দেওয়া হতো। তারা বিভিন্ন সময়ে কিছু ব্যক্তিকে জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত করে সেটির তালিকা ডিজিএফআইয়ের কাছে দিত।
তিনি বলেন, ‘আমরা যতই অস্বীকার করার চেষ্টা করি না কেন, সেনাবাহিনী কলুষিত হয়েছে। আমাদের উচিত হবে না, আত্মশুদ্ধির যে সুযোগ এসেছে তা কোনো অবস্থাতেই হেলায় হারানো। এতে সেনাবাহিনীর গৌরব ক্ষুণ্ণ হবে না বরং সেনাবাহিনী গৌরবের উচ্চ শিখরে আসীন হবে।’
তিনি আরও বলেন, পুরো জাতি জানবে সেনাবাহিনী কখনো দোষী ব্যক্তিদের ছাড় দেয় না। এতে সেনাবাহিনীর গৌরব এবং সম্মানের সাইনবোর্ডের আড়ালে অফিসারদের অপকর্ম করে পার পেয়ে যাওয়ার প্রবৃত্তি দূর হবে। র্যাব অবিলম্বে বিলুপ্ত করা দরকার এবং সেটি সম্ভব না হলে সামরিক সদস্যদের সামরিক বাহিনীতে ফিরিয়ে আনা উচিত।
তিনি বলেন, আমি আরও চাই, ডিজিএফআইও বিলুপ্ত করা হোক। কারণ, এই সংস্থাটি আয়নাঘরের মতো অপসংস্কৃতি জন্ম দেওয়ার পরে টিকে থাকার বৈধতা হারিয়েছে।
খবরটি শেয়ার করুন