শুক্রবার, ৩রা এপ্রিল ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৯শে চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সাংবাদিকদের হাতকড়া: ক্ষমতার প্রয়োগ না অপপ্রয়োগ?

জেবিন শান্তনু

🕒 প্রকাশ: ০২:১৫ পূর্বাহ্ন, ৩রা এপ্রিল ২০২৬

#

থানায় নিয়ে দুই সাংবাদিকের কাছ থেকে মুচলেকা আদায় করা হয়। ছবি: সংগৃহীত

কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কার্যালয় থেকে দুই সাংবাদিককে হাতকড়া পরিয়ে থানায় নেওয়ার ঘটনা প্রশাসন এবং সাংবাদিক সম্পর্কের টানাপোড়েনকে সামনে নিয়ে এসেছে। ঘটনার বিবরণ, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য এবং সামাজিক প্রতিক্রিয়া—সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, এটি কি আইন প্রয়োগের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, নাকি ক্ষমতার আরেকটি অপপ্রয়োগের উদাহরণ?

গত বুধবার (১ এপ্রিল) দুপুরে চান্দিনা উপজেলার ভূমি অফিসে নামজারি–সংক্রান্ত শুনানিকে কেন্দ্র করে এই ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী দুই সাংবাদিক—দৈনিক মানবজমিনের দেবিদ্বার প্রতিনিধি রাসেল সরকার এবং অনলাইন পোর্টাল ফেস দ্য পিপল-এর প্রতিনিধি আব্দুল আলীম—অভিযোগ করেন, দীর্ঘ অপেক্ষার পর শুনানির বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফয়সাল আল নূর উত্তেজিত আচরণ করেন।

অবশ্য এ ঘটনার পরদিন বৃহস্পতিবার ফয়সাল আল নুরকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তাকে সিলেট বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাঠ প্রশাসন-১ শাখার জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব মো. বরমান হোসেন স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এই আদেশ দেওয়া হয়েছে। রাত ৯টার দিকে কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. সাইফুল ইসলাম সুখবর ডটকমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলো প্রায়ই অভিযোগ করে যে, গুরুতর অপরাধের পর অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি না দিয়ে শুধু প্রত্যাহার করায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়। কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ উঠলে তাদের কেবল কর্মস্থল থেকে প্রত্যাহার (ক্লোজড) করা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে গণ্য হয় না।

একে প্রায়শই প্রকৃত শাস্তির বদলে দায় এড়ানোর বা সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। প্রত্যাহার বা ক্লোজড করার অর্থ হলো পুরনো দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নেওয়া, কিন্তু এটি বরখাস্ত বা শাস্তিমূলক বদলি নয়।

আব্দুল আলীমের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণের চেষ্টা করলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে এসি ল্যান্ডের নির্দেশে পুলিশ এসে তাদের আটক করে এবং হাতকড়া পরিয়ে থানায় নিয়ে যায়। পরে থানায় নিয়ে তাদের ফোন জব্দ করা হয় এবং হাতকড়া পরিহিত অবস্থায় ফোন আনলক করিয়ে ভেতরের ছবি–ভিডিও মুছে ফেলার অভিযোগও তোলেন তিনি। শেষে মুচলেকা নিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

হাতকড়া পরানোর সময় সাংবাদিক পরিচয় পুলিশের কাছে দিয়েছেন কিনা জানতে চাইলে আব্দুল আলিম বলেন, ‘পুলিশ যখন আমাদের হাতকড়া পরিয়ে থানায় নিয়ে যায়, এ সময় আমরা একাধিকবার বলেছি, আমরা সংবাদকর্মী। কেন আমাদের হাতকড়া পরাচ্ছেন? তখন পুলিশ সদস্যরা বলেছেন, “ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ, আমাদের কিছুই করার নেই।’”

অভিযোগ অস্বীকার করে ফয়সাল আল নূর মুঠোফোনে সুখবর ডটকমকে বলেন, অনুমতি ছাড়া ভিডিও ধারণ এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার কারণে তাদের থানায় পাঠানো হয়েছে। তার দাবি, পুরো ঘটনাটি হয়েছে ভুল–বোঝাবুঝির কারণে। হাতকড়া পরানোর আগপর্যন্ত জানতেন না ওই দুজন সংবাদকর্মী। পরে দুই পক্ষ বসে বিষয়টি সমাধান করা হয়েছে।

চান্দিনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান সুখবরের কাছে দাবি করেন বক্তব্য, একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশনা অনুযায়ী পুলিশ দায়িত্ব পালন করেছে, পুলিশের নিজস্ব কোনো উদ্যোগ ছিল না।

কুমিল্লা প্রেসক্লাবের সভাপতি কাজী এনামুল হক ফারুক এই ঘটনাকে “দুঃখজনক ও নিন্দনীয়” উল্লেখ করে বলেন, সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ভুল হলে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু হাতকড়া পরানো অগ্রহণযোগ্য।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—প্রথমত, সরকারি দপ্তরে ভিডিও ধারণের সীমা কোথায়; দ্বিতীয়ত, হাতকড়া ব্যবহারের যৌক্তিকতা কী। সাধারণত, গুরুতর অপরাধ বা পালানোর ঝুঁকি না থাকলে হাতকড়া পরানোর প্রয়োজন হয় না। ফলে প্রশ্ন উঠছে, দুই সাংবাদিকের ক্ষেত্রে এমন ব্যবস্থা কতটা প্রয়োজনীয় ছিল।

মানবাধিকার বিশ্লেষকেরা বলছেন, “ভিডিও ধারণ নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু সেটি কোনোভাবেই ব্যক্তির মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের যুক্তি হতে পারে না। বিশেষ করে ফোনের তথ্য মুছে ফেলার অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা গুরুতর অধিকার লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে।”

দেশে মাঠপর্যায়ে প্রশাসন ও সাংবাদিকদের মধ্যে সম্পর্ক প্রায়ই দ্বৈত চরিত্রের—একদিকে পারস্পরিক নির্ভরতা, অন্যদিকে অবিশ্বাস। স্থানীয় পর্যায়ে অনেক সময় তথ্যপ্রাপ্তি, দুর্নীতি অনুসন্ধান বা আচরণগত বিরোধ থেকেই সংঘাতের সূত্রপাত হয়। চান্দিনার ঘটনাটি সেই বৃহত্তর বাস্তবতারই প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

এদিকে সামাজিক মাধ্যমে দুই সাংবাদিককে হাতকড়া পরানো অবস্থার একটি ছবি ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। কুমিল্লায় কর্মরত সাংবাদিকদের মধ্যেও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অনেক নেটিজেন প্রশ্ন তুলেছেন, “ভিডিও ধারণ কি এত বড় অপরাধ যে হাতকড়া পরাতে হবে?” আবার কেউ কেউ বলেছেন, “সরকারি দপ্তরে শৃঙ্খলা রক্ষা জরুরি, তবে সেটির প্রয়োগ হতে হবে সংযত ও আইনসম্মত।”

একজন জনপ্রিয় অনলাইন মন্তব্যকারী লিখেছেন, “আইনের প্রয়োগ যদি ভীতি তৈরির মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সাধারণ মানুষ ও সাংবাদিক উভয়ের জন্যই তা উদ্বেগজনক সংকেত।”

কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. সাইফুল ইসলাম সুখবর ডটকমকে জানিয়েছেন, ঘটনাটি প্রশাসনের নজরে এসেছে এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অভিজ্ঞরা বলছেন, চান্দিনার এই ঘটনা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার, নাগরিক অধিকার এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার মধ্যকার সূক্ষ্ম ভারসাম্যের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটন এবং দায় নির্ধারণই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—কারণ, এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে জবাবদিহির বিকল্প নেই।

সাংবাদিক

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250