স্লোজ্যামাস্তানের সুলতান র্যান্ডি উইলিয়ামস। ছবি: স্লোজ্যামাস্তান প্রোপাগান্ডা অফিস
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ‘নতুন দেশ’। আয়তন ১১ দশমিক শূন্য সাত একর। বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তির ভৌগোলিক অখণ্ডতা নষ্ট করে নতুন ‘রাষ্ট্রের’ ঘোষণা দেন এর স্বঘোষিত সুলতান। শুধু তাই নয়, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সামরিক জোট ন্যাটোকেও তিনি ফেলে দেন ‘সংকটে’।
নতুন ও ক্ষুদ্র এই দেশের নাগরিক হতে ইচ্ছুক অনেকেই। খাস যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বাসিন্দা নিজেদের দেশের ভেতরেই গড়ে ওঠা ওই নতুন দেশের ‘নাগরিক’ হয়েছেন। তাদের কেউ প্রচলিত রাষ্ট্র ও শাসন ব্যবস্থার প্রতি বিরক্ত; কেউ আবার এমন দেশের নাগরিক হওয়াকে ‘মজার’ বিষয় বলে মনে করছেন।
নাগরিক হওয়ার আগ্রহীদের তালিকায় আছে বাংলাদেশিদেরও নাম। এ কথা জানিয়েছেন খোদ ‘সুলতান’। কথা হচ্ছে এক ‘কল্পরাষ্ট্র’কে নিয়ে। ‘দেশটির’ চারপাশ কাঁটাতারে ঘেরা। নেই বিদ্যুৎ-পানির ব্যবস্থা। নেই বাড়িঘর, অবকাঠামো। তবে আছে সেনা ও বিমানবাহিনী।
ঊষর মরুর এই ‘দেশটি’তে নাকি নৌবাহিনীও আছে—এমন দাবি করেছেন দেশটির রাজা। এ দেশটির রাজা নিজেকে ‘সুলতান’ বলে পরিচয় দেন প্রজা ও পরদেশিদের কাছে। হ্যাঁ, জনমানবহীন এই দেশটির প্রজাও আছে।
আরও আছে—নিজস্ব মুদ্রা, পতাকা, পাসপোর্ট এবং জাতীয় ফল ও পশু। বিদেশিদের এই ‘দেশে’ ঢুকতে প্রয়োজন হয় ভিসার। এই ভিসা দেন সুলতান নিজেই। একজনের ‘নাগরিকত্ব’ খারিজ করার একচ্ছত্র অধিকারও তার হাতে।
তবুও অনেকে উপহাস করে বলেন, ‘ঢাল নাই তলোয়ার নাই, নিধিরাম সরদার’। লোকে যাই বলুক, তিনি নিজেকে ‘সুলতান’ ভাবেন। বিশ্ববাসীর কাছে নিজের পরিচয় দেন, ‘সুলতান অব স্লোজ্যামাস্তান’ বা ‘স্লোজ্যামাস্তানের সুলতান’ হিসেবে।
তিনি র্যান্ডি উইলিয়ামস। পেশায় সংগীতশিল্পী। ঘুরেছেন জাতিসংঘের স্বীকৃত ১৯৩টি দেশ। একসময় ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে সিদ্ধান্ত নেন, নিজেই একটি দেশ বানাবেন।
যে কথা সেই কাজ। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ক্যারোলিনার ইম্পেরিয়াল কাউন্টিতে জমি কিনে সেখানে নতুন দেশ গড়ার ঘোষণা দেন উইলিয়ামস। যুক্তরাষ্ট্রের অখণ্ডতা নষ্ট করায় তাকে তাড়াতে ন্যাটোকেও মাঠে নামতে হয়েছিল। উইলিয়ামসের ভাষ্য—‘এরপর ন্যাটো পালিয়ে যায়। ওরা বাস্তবতা বুঝতে পেরেছে।’
তবে তিনি ‘স্লোজ্যামাস্তানকে’ ন্যাটোর সদস্য ভাবেন। তিনি যোগাযোগ রাখেন ন্যাটোর সঙ্গে। যুক্তরাষ্ট্রে ন্যাটোর অনুষ্ঠান হলে তিনি সেখানে তার ‘সরকারি’ কর্মকর্তাদের নিয়ে যোগ দেন।
র্যান্ডি উইলিয়ামসের ওপর যুক্তরাষ্ট্র নানা বিধিনিষেধ চাপানোয় তিনি মেক্সিকোর পাসপোর্ট ব্যবহার করছেন। থাকছেন দক্ষিণ ক্যারোলিনার সান দিয়েগো শহরে। সেখানে থেকে পরিচালনা করছেন নিজের ‘দেশ’ স্লোজ্যামাস্তান।
অনেকের মতে, একটি দেশের ভেতরে আরেকটি দেশ থাকতেই পারে। যেমন—রোমের ভেতর স্বাধীন ভ্যাটিকান বা ইতালির ভেতর সান মারিনো অথবা দক্ষিণ আফ্রিকার ‘পেটের ভেতরের দেশ’ লেসোথো। আবার অনেকের প্রশ্ন—তাই বলে, যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ‘নতুন দেশ’?
২০২১ সালের কথা। মেক্সিকোর সীমানাঘেঁষা যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ক্যারোলিনার ইম্পেরিয়াল কাউন্টিতে ১১ দশমিক শূন্য সাত একর জমি কিনে সেখানে দেশ গড়ার ঘোষণা দেন র্যান্ডি উইলিয়ামস। যেন, জমি কিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গড়ার ইতিহাস থেকে এমন শিক্ষা নিয়েছেন তিনি!
তার নবগঠিত ও ক্ষুদ্র দেশটির নাম দিয়েছেন ‘রিপাবলিক অব স্লোজ্যামাস্তান’ বা ‘স্লোজ্যামাস্তান প্রজাতন্ত্র’। নিজেকে দেশটির ‘সুলতান’ ঘোষণা দিয়েছেন। অর্থাৎ, সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী।
এই আমেরিকান ডিজে ও মিউজিক হোস্ট সাপ্তাহিক সিন্ডিকেটেড রেডিও অনুষ্ঠান ‘সানডে নাইট স্লো জ্যামস’ চালান। তার এই গানের অনুষ্ঠান ১৭ দেশের প্রায় ২০০ রেডিও স্টেশনে প্রচারিত হয়।
নিজের গানের অনুষ্ঠান ‘স্লো জ্যামস’-এর সঙ্গে ফারসি শব্দ ‘স্তান’ যোগ করে তিনি নিজের দেশের নাম রেখেছেন ‘স্লোজ্যামাস্তান’। তার এই নতুন দেশের ‘নাগরিকের’ সংখ্যা ২৫ হাজারের বেশি।
স্লোজ্যামাস্তানের ‘সুলতান’ র্যান্ডি উইলিয়ামস ঘুরেছেন সারা পৃথিবী। একসময় মধ্য এশিয়ার উজবেকিস্তান-তাজিকিস্তানে ঘুরে মুগ্ধ হন এই বিশ্বপর্যটক। সেসব দেশের নামের শেষ অংশ নিজের দেশের নামের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ফারসি ‘স্তান’ বা বাংলা ‘স্থান’-এর অর্থ ভূমি।
গত ৩ এপ্রিল সান দিয়েগোর সিবিএস এইট-এ প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে ‘স্লোজ্যামাস্তানের সুলতান’ তার ‘দেশের’ নামকরণ প্রসঙ্গে এসব তথ্য জানান।
তবে অনুষ্ঠানের সঞ্চালকরা তাকে নিয়ে উপহাস করলে তিনি হেসে বলেন—‘দেখুন, রোম একদিনে গড়ে উঠেনি। আমরাও ধীরে ধীরে গড়ে উঠবো।’
তিনি জানান—আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসারে ভূখণ্ড, নাগরিক ও সরকার থাকলেই তা দেশ হিসেবে বিবেচিত হয়। ‘একটি দেশের অস্তিত্ব অন্য দেশ স্বীকৃতির ওপর নির্ভর করে না,’ বলেও মন্তব্য করেন ‘সুলতান’ উইলিয়ামস।
তার প্রশ্ন, ‘পৃথিবীতে এমন দেশ আছে যেগুলোকে অনেক দেশ স্বীকৃতি দেয়নি। তাই বলে সেসব দেশ কি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য হচ্ছে না?’
শিকাগোতে জন্ম নেওয়া উইলিয়ামস আশা করেন, আজ যারা তাকে অবজ্ঞা করছেন একদিন তারা নিজেদের ভুল বুঝতে পারবেন। তিনি চান, তার নতুন দেশে নতুন নতুন বিনিয়োগ আসুক।
তার ‘নতুন দেশ’ নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো প্রতিনিয়ত প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। বিষয়টিকে তিনি আশাব্যঞ্জক হিসেবে দেখছেন। সংবাদমাধ্যমগুলোকে উইলিয়াম হাসিমুখে প্রত্যয়ের সঙ্গে জানান—তার ‘দেশ’ ছোট হতে পারে কিন্তু, তাদের স্বপ্ন অনেক বড়।
গত ১ এপ্রিল বিবিসি যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে স্বঘোষিত ‘স্লোজ্যামাস্তান প্রজাতন্ত্র’ নিয়ে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, মেক্সিকোর সীমান্তবর্তী ক্যালিফোর্নিয়ার কোচেলা উপত্যকায় জনমানবহীন বিস্তীর্ণ ঊষর মরু অঞ্চলে গড়ে তোলা হচ্ছে ‘স্লোজ্যামাস্তান’। কোনো দেশ একে স্বীকৃতি তো দেয়নি উল্টো হেসে উড়িয়ে দিয়েছে।
সংবাদ প্রতিবেদনে একে বিশ্বের সবচেয়ে ‘নতুন ও ক্ষুদ্র দেশ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। জানানো হয়েছে—দেশটির প্রধান র্যান্ডি উইলিয়ামসকে ডাকা হচ্ছে ‘সুলতান অব স্লোজ্যামাস্তান’ বলে।
তার হাতেই ‘দেশটির’ সব ক্ষমতা। তার কথাই ‘আইন’, যদিও তিনি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পক্ষে।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়—পৃথিবী ঘুরে দেখা মানুষ র্যান্ডি উইলিয়ামস। জাতিসংঘের স্বীকৃত সব দেশেই তার পা পড়েছে। কিন্তু, ২০২০ সালে করোনা মহামারির কারণে বিশ্বজুড়ে লকডাউন শুরু হলে ‘আটকে যায়’ তার পা।
অস্থিরচেতা উইলিয়ামসের হাতে তখন অনেক সময়, অথচ কোথাও যাওয়ার সুযোগ নেই। এমন পরিস্থিতিতে তার মন ঘুরে বেড়ায় ‘যুদ্ধবিমানের’ গতিতে। তখনই ঘটে এক নতুন ঘটনা।
উইলিয়ামের ভাষ্য: ‘যদি কোনো দেশে যেতে না পারি তাহলে নিজেই একটা দেশ বানাই না কেন?’
এরপর যা ঘটে তা ইতিহাস। তার কেনা জমি হয়ে যায় ‘দেশ’। তিনি হন ‘সুলতান’। হন আলোচনার বিষয়ও।
স্লোজ্যামাস্তানের রাজধানী দুবলানডিয়া। অঙ্গরাজ্য ১৩টি। কেউ চাইলে নিজের নামে এর একটি অঙ্গরাজ্যের নামকরণ করতে পারেন বলে দেশটির ‘সরকারি’ ওয়েবসাইটটিতে জানানো হয়েছে।
গণপ্রজাতন্ত্রী স্লোজ্যামাস্তানের ওয়েবসাইটে দাবি করা হয়েছে, এটিই বিশ্বের সবচেয়ে নতুন দেশ। এর আনুষ্ঠানিক নাম দ্য ইউনাইটেড টেরিটরিস অব দ্য সভরেইন ন্যাশন অব দ্য পিপলস রিপাবলিক অব স্লোজ্যামাস্তান।
ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের মহাসড়ক ৭৮ ধরে স্লোজ্যামাস্তানে যাওয়া যায়। সান দিয়েগো থেকে গাড়িতে প্রায় ২ ঘণ্টার পথ। এই দেশটিতে যেতে ভিসার প্রয়োজন হয়। এর সীমান্ত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত।
সিবিএস এইট-এর সাক্ষাৎকারটিতে ‘সুলতান’ উইলিয়ামস জানান, তার দেশের সীমানাজুড়ে ‘স্থল মাইন’ পুতে রাখা আছে। যাতে কেউ অনুপ্রবেশ বা কোনো দেশ আগ্রাসন চালাতে না পারে।
তবে সেসব ‘মাইন’ মেক্সিকোর চিনি দিয়ে তৈরি। অর্থাৎ, মাইনগুলো একেকটি ‘মিছরির দলা’। তিনি আরও জানান, স্লোজ্যামাস্তানের মুদ্রার নাম ‘ডুবোল’। এটি মার্কিন ডলারের সমমানের।
সিবিএস এইট-এর এক ভিডিওতে দেখা যায়—কাঁটাতারে ঘেরা একটি বিস্তীর্ণ এলাকা। মূল ফটকে নিরাপত্তারক্ষী। আছে অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাও। খোলা জায়গায় চেয়ার-টেবিল পেতে বসে আছেন ‘সুলতান’।
‘স্লোজ্যামাস্তানে’ ঢুকতে সুলতানের অনুমতি লাগে। অতিথিদের দেশটির জাতীয় ফল চেরি খাওয়ানো হয়। যদিও এই ফল সেই ‘দেশে’ জন্মায় না। আনতে হয় ‘বাইরে’ থেকে। এ ছাড়াও, মরু অঞ্চল হওয়ায় বিশেষ ব্যবস্থাপনায় ঠান্ডা পানীয় তুলে দেওয়া হয় অতিথিদের হাতে।
বিবিসির প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, এই এক টুকরো জমি কিনতে উইলিয়ামসের খরচ হয়েছিল সাড়ে ১৯ হাজার ডলার। তখন সেই এলাকাটি পরিত্যক্ত ছিল। চারদিকে বালি-পাথর। বুনো ঘাসের ঝোপ।
উইলিয়ামসের বাড়ি সান দিয়েগো থেকে সেই এলাকাটির কাছেই। গাড়িতে যেতে হয়। যাওয়ার প্রশস্ত রাস্তাও আছে। ভিডিওতে দেখা যায়—এখনো সেই এলাকাটি বালুময় ও পাথুরে।
১৯৯৪ সাল থেকে র্যান্ডি উইলিয়ামস রেডিও অনুষ্ঠান ‘সানডে নাইট স্লো জ্যামস’-এর সঞ্চালক হিসেবে কাজ করে আসছেন। এই ‘স্লো জ্যামস’ এর সঙ্গে তিনি ‘স্তান’ শব্দটি জুড়ে দিয়ে ‘স্লোজ্যামাস্তান’ শব্দটি তৈরি করেন। পরে তিনি সেই শব্দ-যুগল বেছে নেন তার নবগঠিত রাষ্ট্রের নাম হিসেবে।
‘সুলতান’ উইলিয়ামস রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি সান ডিয়েগোর জি-নাইনটি ও ম্যাজিক নাইনটি-টু পয়েন্ট ফাইভ রেডিওর প্রোগ্রাম ডিরেক্টর হিসেবেও কাজ করছেন।
খবরটি শেয়ার করুন