ফাইল ছবি
দেশের স্বাস্থ্যচিত্র গত তিন দশকে বড় ধরনের রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে। একসময় যে সংক্রামক রোগগুলো ছিল জনস্বাস্থ্যের প্রধান হুমকি, সেগুলোর অনেকটাই এখন নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু তার জায়গা দখল করে নিয়েছে অসংক্রামক ও দীর্ঘমেয়াদি রোগ। একই সময়ে সংক্রামক রোগ পুরোপুরি নির্মূল না হওয়ায় নতুন করে তৈরি হয়েছে এক জটিল বাস্তবতা—‘রোগের দ্বৈত বোঝা’।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই পরিস্থিতিকে ‘ডাবল বার্ডেন অব ডিজিজ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। অর্থাৎ, একদিকে ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ, ক্যানসারের মতো অসংক্রামক রোগে মৃত্যুহার বাড়ছে, অন্যদিকে ডেঙ্গু, হাম কিংবা যক্ষ্মার মতো সংক্রামক রোগও মাঝেমধ্যে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। ফলে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে বহুমাত্রিকভাবে।
বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বাংলাদেশে সংক্রামক রোগের প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। টিকাদান কর্মসূচি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার বিস্তার এবং জনসচেতনতার কারণে ডায়রিয়া, কলেরা, ডিফথেরিয়া, হুপিং কাশি ও টিটেনাসের মতো রোগ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
পোলিও নির্মূল হয়েছে, কালাজ্বরও কার্যত নির্মূলের পথে। যক্ষ্মা পুরোপুরি নির্মূল না হলেও শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ম্যালেরিয়া এখন মূলত পাহাড়ি এলাকায় সীমিত।
কিন্তু এই সাফল্যের সমান্তরালে শুরু হয় আরেকটি নীরব পরিবর্তন। একবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে দ্রুত বাড়তে থাকে অসংক্রামক রোগের প্রকোপ। ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, ক্যানসার—এসব রোগ এখন মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে।
একটি গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৮৬ সালে দেশে মোট মৃত্যুর মাত্র ৮ শতাংশ ছিল অসংক্রামক রোগে। ২০০৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৮ শতাংশে। বিপরীতে সংক্রামক রোগে মৃত্যু ৫২ শতাংশ থেকে কমে ১১ শতাংশে নেমে আসে। গবেষকেরা এই পরিবর্তনকে ‘মহামারি পর্যায়ের রূপান্তর’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, দেশে এখন অসুখ-বিসুখে মোট মৃত্যুর ৭০ দশমিক ২৬ শতাংশই ঘটছে অসংক্রামক রোগে। এর মধ্যে হৃদ্রোগে ৩৪ শতাংশ, ক্যানসারে ১০ শতাংশ, দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগে ৭ শতাংশ, ডায়াবেটিসে ৪ শতাংশ এবং অন্যান্য অসংক্রামক রোগে ১১ শতাংশ মানুষের মৃত্যু ঘটে।
প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে স্ট্রোকে মারা যাচ্ছেন ৮০ জন, ইস্কেমিক হৃদ্রোগে ৫৯ জন, সিওপিডিতে ৩১ জন এবং ডায়াবেটিসে ১৯ জন। অন্যদিকে সংক্রামক রোগের মধ্যে যক্ষ্মায় প্রতি লাখে ২৬ জন, ডায়রিয়ায় ১৮ জন এবং নিম্ন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে ১৬ জনের মৃত্যু হচ্ছে।
স্পষ্টতই মৃত্যুহার বেশি অসংক্রামক রোগে। তবে সংক্রামক রোগ এখনো উল্লেখযোগ্য স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে।
সংক্রামক রোগ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি—এ বাস্তবতা নতুন করে সামনে এনেছে সাম্প্রতিক কিছু প্রাদুর্ভাব। ডেঙ্গু এখন প্রায় প্রতি বছরই বড় আকারে দেখা দিচ্ছে। হাম নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে। চিকুনগুনিয়া আবার ফিরে এসেছে। এমনকি বাদুড়বাহিত ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসের মতো ঝুঁকিও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বহু ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তার। এটি চিকিৎসাব্যবস্থার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। সাধারণ সংক্রমণও অনেক ক্ষেত্রে জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অসংক্রামক রোগ বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। দ্রুত নগরায়ণ, আয় বৃদ্ধি, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া, তামাক ব্যবহার এবং মানুষের আয়ু বৃদ্ধি—এসবই বড় ভূমিকা রাখছে।
অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণ, প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রতি ঝোঁক, অনিয়মিত জীবনযাপন—এসব কারণে স্থূলতা বাড়ছে, যা ডায়াবেটিস ও হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে মানসিক চাপ, ঘুমের অভাব এবং পরিবেশদূষণও স্বাস্থ্যঝুঁকিকে জটিল করে তুলছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনো এই দ্বৈত চাপ মোকাবিলার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় যে কাঠামো তৈরি হয়েছে, তা তুলনামূলকভাবে কার্যকর হলেও অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উদ্যোগ।
পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট (ইলেকট) অধ্যাপক ডা. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, ‘অসংক্রামক রোগ দ্রুত বেড়েছে, সংক্রামক রোগও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। সমস্যা মূলত পরিকল্পনা ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় ঘাটতি, অর্থায়নের অভাব। বড় হাসপাতাল তৈরি করে বা যন্ত্রপাতি কিনে সমাধান হয় না। জনসচেতনতা, স্বাস্থ্যশিক্ষা ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় ছাড়া রোগের বোঝা কমানো কঠিন।’
তিনি আরও বলেন, গ্রাম ও শহরে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করে রোগপ্রতিরোধ, দ্রুত শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পারলে ভবিষ্যতে এই দ্বৈত চাপ কমানো সম্ভব।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, সংক্রামক রোগপ্রতিরোধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সমন্বয়ে কার্যক্রম পরিচালনার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, ‘আমরা কোনো ডিজিজ বার্ডেন চাই না।’
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রোগের এই দ্বৈত বোঝা মোকাবিলার মূল কৌশল হলো প্রতিরোধ। জন্ম থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত জীবনচক্রজুড়ে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন নিশ্চিত করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে সুষম খাদ্য, নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম, তামাক বর্জন এবং মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা।
একই সঙ্গে প্রয়োজন শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা, নিয়মিত স্ক্রিনিং, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং সাশ্রয়ী চিকিৎসাসেবা। সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে টিকাদান, পরিচ্ছন্নতা ও নজরদারি জোরদার করতে হবে।
বাংলাদেশ এখন স্বাস্থ্যখাতে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে অর্জিত সাফল্য ধরে রেখে অসংক্রামক রোগের বিস্তার রোধ করতে না পারলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। তাই এখনই সমন্বিত, দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়াই সময়ের দাবি।
জে.এস/
খবরটি শেয়ার করুন