শুক্রবার, ১৩ই মার্চ ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৮শে ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** বিতর্কিত শোক প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন তুললেন মাসুদ কামাল *** ‘ওসমান হাদি হত্যার পেছনে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থাকতে পারে’ *** ইরান যুদ্ধ কি ভারতের অর্থনৈতিক উত্থান থামিয়ে দেবে *** রূপপুর থেকে ডিসেম্বরে জাতীয় গ্রিডে আসবে ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ *** স্বামীর মার খেয়েছ, মরে তো যাওনি—বিচ্ছেদ চাইতে আসা নারীকে আফগান বিচারক *** বাংলাদেশকে অতিরিক্ত ডিজেল দেওয়ার অনুরোধ বিবেচনা করছে ভারত *** রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন সংসদে ‘মিটিমিটি হাসি’ হাসছিলেন কেন *** সময়ের সঙ্গে ড. ইউনূস সরকারের নানা অপকর্মের ঘটনা সামনে আসছে *** হরমুজ প্রণালি বন্ধই থাকবে—প্রথম ভাষণে মোজতবা খামেনির হুঁশিয়ারি *** ইরানে সরকার পতনের ঝুঁকি নেই: মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা

রাষ্ট্রপতির ভাষণে মিশে থাকল ‘ভাগ্যের নির্মম পরিহাস’

নিজস্ব প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ০৭:১০ অপরাহ্ন, ১২ই মার্চ ২০২৬

#

ফাইল ছবি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে আজ বৃহস্পতিবার (১২ই মার্চ) জামায়াতে ইসলামীর জোটের সংসদ সদস্যদের প্রতিবাদ ও ওয়াকআউটের মধ্যে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন যে ভাষণ দিলেন, তাতে মিশে থাকল তার ‘ভাগ্যের নির্মম পরিহাস’।

প্রায় জীবনভর আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকা সাহাবুদ্দিন আজ বিকেলে ভাষণের শুরুতে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করতে গিয়ে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে তিনি বললেন ‘স্বাধীনতার ঘোষক’।

মো. সাহাবুদ্দিনকে বারবার বলতে হল, আওয়ামী লীগ সরকার ছিল ‘ফ্যাসিস্ট’। আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশকে ‘দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন’ বানিয়েছিল। পরে বিএনপি সরকারের ‘কঠোর পদক্ষেপে’ বিশ্বে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কলঙ্ক থেকে বাংলাদেশ ‘মুক্তি পেয়েছিল’।

বিএনপি সরকার তার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণে দেশের জন্য কী কী করবেন, তার বিস্তারিত ফিরিস্তি রাষ্ট্রপতি তার ভাষণে দিলেন। তিনি ভাষণ শেষ করলেন ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ বলে।

রাষ্ট্রপতির ভাষণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল স্বাধীনতার ইতিহাস ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে। সেখানে তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষক এবং 'বাংলাদেশ জিন্দাবাদ' স্লোগানের প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন।

সমালোচকদের মতে, রাষ্ট্রপতির মতো সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তির কাছ থেকে ইতিহাসের বিতর্কিত ব্যাখ্যার বদলে ঐকমত্যভিত্তিক অবস্থান প্রত্যাশিত ছিল। কারণ স্বাধীনতার ঘোষণার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এবং এ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, রাষ্ট্রপতি সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের অভিভাবকসুলভ প্রতীক। ফলে তার বক্তব্যে দলীয় রাজনৈতিক বিতর্ক এড়িয়ে চলাই অধিক গ্রহণযোগ্য। কিন্তু সংসদে দেওয়া এই ভাষণে কিছু মন্তব্য এমনভাবে এসেছে, যা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়ানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছেন নেটিজেনরা।

নেটিজেনদের মতে, রাষ্ট্রপতির ভাষণ সাধারণত সরকারের নীতি ও পরিকল্পনার সারসংক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপিত হয়। কিন্তু সেখানে যদি ইতিহাসের বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যাখ্যা উঠে আসে, তাহলে তা নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করতে পারে।

বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের কেউ কেউ বলেছেন, রাষ্ট্রপতির বক্তব্য জাতীয় ঐক্যের পরিবর্তে রাজনৈতিক বিভাজনকে উসকে দিতে পারে। তাদের মতে, রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব হওয়া উচিত সব পক্ষকে একসঙ্গে নিয়ে চলার বার্তা দেওয়া।

তবে সরকারপন্থী মহলের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের মতে, রাষ্ট্রপতি ইতিহাসের একটি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন মাত্র, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহুদিন ধরে আলোচিত।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পাওয়া মো. সাহাবুদ্দিন অতীতে বক্তব্য শেষ করতেন ‘জয় বাংলা’ বলে। বিএনপি জিয়াকে স্বাধীনতার ঘোষক বলে দাবি করে এলেও আওয়ামী লীগ তা সব সময় প্রত্যাখ্যান করেছে।

২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দিন জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণ রাষ্ট্রপতি ‘জয় বাংলা’ ছাড়াই শেষ করেন। এরপর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আঠারো মাসে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করে গেলেও রাষ্ট্রীয় কোনো আয়োজনে তার বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ হয়নি।

১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জিতে বিএনপির নতুন সরকার শপথ নেওয়ার পর গত ৬ই মার্চ প্রথম কোনো সরকারি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন মো. সাহাবুদ্দিন। শিল্পকলা একাডেমি চত্বরে জাতীয় পাট দিবসের ওই অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির বক্তব্য শেষ হয় বিএনপির ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ দিয়ে, যা নিয়ে সেদিনও আলোচনা-সমালোচনা হয় ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০২৩ সালের ২৪শে এপ্রিল পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছিলেন ৭৫ বছর বয়সী সাহাবুদ্দিন। এক সময় তিনি ছিলেন দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার, তখন দেশের মানুষ তাকে সাহাবুদ্দিন চুপপু নামে চিনত। 

রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর ওই সময়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে পরামর্শ দেন, নামের অংশ থেকে চুপ্পু শব্দটি কেটে দিতে। রাষ্ট্রপতির মতো রাষ্ট্রের সবচেয়ে মর্যাদাবান নাগরিকের নাম হিসেবে চুপ্পু শব্দটি বেমানান বলে তখন অভিমত ব্যক্ত করেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনার প্রতি আনুগত্য হিসেবে বাবা-মায়ের দেওয়া চুপ্পু নামটি নিজের নামের অংশ থেকে বাদ দেন মো. সাহাবুদ্দিন।

রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিন বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। এর বাইরে পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক। দেশের কার্যনির্বাহী ক্ষমতা থাকে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে।

এমনকি সংসদে যে ভাষণ রাষ্ট্রপতি দেন, তাও মন্ত্রিসভায় অনুমোদন হতে হয়। সংসদীয় রীতি অনুযায়ী, সরকারের নীতি ও কর্মপরিকল্পনার কথাই তিনি ওই ভাষণে তুলে ধরেন। ফলে নিজের দর্শন ও অবস্থান তুলে ধরার খুব বেশি স্বাধীনতা কার্যত তার থাকে না।

আজ বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে যখন ভাষণ দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের সংসদের অধিবেশন কক্ষে প্রবেশের ঘোষণা দেওয়া হল, বিরোধী দলের আসনে থাকা জামায়াত জোটের সংসদ সদস্যরা আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেন। এ সময় তারা ‘জুলাইয়ের সাথে গাদ্দারি চলবে না’ লেখা লাল রঙের প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন।

সংসদ কক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রবেশ করলে প্রচলিত রীতিতে সংসদ নেতা ও সরকারি দলের সদস্যরা দাঁড়িয়ে তাকে অভিবাদন জানান। তবে বিরোধী দলের সদস্যদের একটি অংশ প্রতিবাদের অংশ হিসেবে নিজেদের আসনে বসে থাকেন।

জাতীয় সংসদের অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের দেওয়া ভাষণকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ভাষণে তিনি স্বাধীনতার ইতিহাস, রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করেন। ভাষণের কিছু অংশকে কেন্দ্র করে বিরোধী দল ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ সমালোচনা করছেন। তাদের মতে, রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে সাংবিধানিক নিরপেক্ষতার প্রত্যাশা পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি।

ভাষণের একপর্যায়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চের প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে যে ঐতিহাসিক পর্ব রয়েছে, সেখানে জিয়াউর রহমানের ঘোষণার বিষয়টিও ইতিহাসের অংশ হিসেবে আলোচিত হয়ে থাকে। তিনি এ সময় 'বাংলাদেশ জিন্দাবাদ' স্লোগানও উচ্চারণ করেন, যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহুল ব্যবহৃত একটি স্লোগান হিসেবে পরিচিত।

রাষ্ট্রপতির এই মন্তব্যের পর সংসদের ভেতরে ও বাইরে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।

অনেকেই মনে করছেন, রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বিভিন্ন দিককে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। আবার কেউ কেউ এটিকে সমসাময়িক রাজনৈতিক বিতর্কের নতুন মাত্রা হিসেবে দেখছেন।

সংসদে রাষ্ট্রপতির এই ভাষণকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। নেটিজেনদের মতে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং রাজনৈতিক স্লোগান নিয়ে রাষ্ট্রপতির মন্তব্য ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।

রাষ্ট্রপতির সংসদীয় ভাষণ সাধারণত আনুষ্ঠানিকতা হিসেবেই বিবেচিত হয়। কিন্তু এবারের ভাষণের কিছু অংশ রাজনৈতিক বিতর্ককে নতুন করে উসকে দিয়েছে। নেটিজেনরা মনে করেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতিহাসের ব্যাখ্যা এখনও একটি সংবেদনশীল বিষয়; ফলে রাষ্ট্রপতির বক্তব্য নিয়েও বিতর্ক হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

সব মিলিয়ে, সংসদে দেওয়া এই ভাষণ শুধু সরকারের নীতিনির্ধারণী বার্তা নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়েও নতুন আলোচনার সূত্রপাত করেছে।

মো. সাহাবুদ্দিন

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250