বৃহস্পতিবার, ২৯শে জানুয়ারী ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৬ই মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ট্রিগারে আঙুল রাখা আছে—ট্রাম্পের ‘ভয়াবহ হামলার’ হুমকির জবাবে ইরান *** শেরপুরের ঘটনায় জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে: অন্তর্বর্তী সরকার *** বাপের জমি বিক্রি করে রাজনীতি করছি, ব্যবসা করতে আসিনি: মির্জা ফখরুল *** নারীরা কখনো জামায়াতের আমির হতে পারবেন না: শফিকুর রহমান *** জামায়াতের নারী ও পুরুষ কর্মীরা ২০টি করে জাল ভোট দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন: নয়ন *** ২২ বছর পর আজ রাজশাহী যাচ্ছেন তারেক রহমান *** ঢাকা-করাচি সরাসরি ফ্লাইট চালু আজ *** বিশ্বজুড়ে ব্যাংকিং খাতে বঞ্চনার শিকার মুসলিমরা *** সরকারি কর্মচারীদের পাঁচ বছরের বেশি থাকা ঠিক না: প্রধান উপদেষ্টা *** আড়াই মাস চেষ্টা করেও আল জাজিরা তারেক রহমানের সাক্ষাৎকার নিতে পারেনি

‘আওয়ামী লীগ সরকারের অর্জনগুলো স্মরণীয় ও অতুলনীয়’

নিজস্ব প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ০৬:৫০ অপরাহ্ন, ২৭শে ডিসেম্বর ২০২৫

#

ছবি: সংগৃহীত

বিশিষ্ট সাংবাদিক ও ইংরেজি পত্রিকা ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেছেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগ বাংলাদেশ সৃষ্টিতে আমাদের নেতৃত্ব দিয়েছে আর শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ দেশ গঠনে আমাদের নেতৃত্ব দিয়েছে। অতীতের অন্য যেকোনো সরকারের চেয়ে আওয়ামী লীগের সরকারের (২০০৯-২০২৪) অর্জনগুলো স্মরণীয় এবং অতুলনীয়। বর্তমান আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনার হাতে গড়া। তিনি দলটিকে পুনরুজ্জীবিত, পুনর্গঠন, উজ্জীবিত করেছেন।

তিনি বলেন, এটাও শেখ হাসিনার একক কৃতিত্ব যে দলটি একটানা ক্ষমতায় ছিল, যার নজির বাংলাদেশে আর দ্বিতীয়টি নেই। ভারতে নির্বাসিত জীবন থেকে ১৯৮১ সালে দেশে ফেরার পর তিনি দলটির নেতৃত্বে আছেন। পঁচাত্তরের ঘাতকেরা এবং পরবর্তীতে দুই সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমান ও জেনারেল এইচ এম এরশাদ ধরেই নিয়েছিলেন যে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া আওয়ামী লীগ বাস্তবে মরে গেছে। এই দুই সরকারই আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে ন্যাক্কারজনক অপপ্রচার চালায়।

তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসে আওয়ামী লীগের ওপর সবচেয়ে নৃশংস আঘাত হেনে একে অস্তিত্ব সংকটের মুখে ফেলা হয়েছিল। জাতীয় চার নেতাকে কারাগারে হত্যা করে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হয় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বকে। আওয়ামী লীগ একসময় সত্যিকার অর্থেই সবচেয়ে সফলভাবে জনগণের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করেছে।

মাহফুজ আনাম বলেন, বাঙালিদের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করার দিক থেকে আর কোনো রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ধারেকাছেও ছিল না। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় থেকে উপমহাদেশে আর কোনো রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের মতো এমন খ্যাতি ও নৈতিক কর্তৃত্ব অর্জন করতে পারেনি। ১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়টি ছিল আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় গৌরবময় অধ্যায়।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জাতীয় দিবস বাতিলের বিষয়ে সরকারের সঙ্গে মাহফুজ আনামের মতামত প্রায় একই হলেও দ্বিমত রয়েছে তিনটি দিবস নিয়ে—৭ই মার্চ (বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের দিনটি), ১৫ই আগস্ট (বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের প্রায় সব সদস্যকে হত্যাকাণ্ডের দিন) এবং ৪ঠা নভেম্বর (গণপরিষদে যেদিন সংবিধান গৃহীত হয়)। তিনি বলেন, এই দিনগুলোতে ইতিহাস রচিত হয়েছিল এবং কোনোভাবেই এগুলোর গুরুত্ব কমানো উচিত নয়। আমাদের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর অবদান অবিস্মরণীয়। আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের মাপকাঠিতে বঙ্গবন্ধুকে বিচার করা ঠিক হবে না। শিক্ষার্থীদের অনুরোধ করব, তারা যেন শেখ হাসিনার অপশাসনের পাল্লায় বঙ্গবন্ধুকে না মাপে।

তিনি বলেন, ১৬ বছর–১৯৭৫ সালের আগস্ট থেকে ১৯৯০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কথা বা তার হত্যাকাণ্ডের কথা আওয়ামী লীগের নিজস্ব পরিসরের বাইরে খুব কম জায়গাতেই উল্লেখ করা হতো। আমরা গর্ব করতে পারি, ১৯৯১ সালে ডেইলি স্টার প্রকাশের পর ১৫ই আগস্টকে বিশেষভাবে তুলে ধরতে শুরু করে। ওই বিরুদ্ধ সময়ে দুই কলামে কালো রঙের বর্ডারে বঙ্গবন্ধুর ছবি প্রকাশ করে। দেশের শীর্ষ পত্রিকাগুলোর মধ্যে ডেইলি স্টারই প্রথম এই ধারার সূচনা করে।

ডেইলি স্টারে প্রকাশিত দুটি উপসম্পাদকীয়তে মাহফুজ আনাম এসব কথা বলেন। দুটির মধ্যে একটি পত্রিকাটির ছাপা সংস্করণ প্রকাশিত হয় বর্তমান সরকারের আমলে, ২০২৪ সালের ১৮ই অক্টোবর। অন্য উপসম্পাদকীয়টি প্রকাশিত হয়েছিল ২০২২ সালের ২৩শে ডিসেম্বরে, আওয়ামী লীগের ২২তম ত্রি-বার্ষিক জাতীয় সম্মেলন সামনে রেখে। মাহফুজ আনামের এই দুটি কলামের লিংক সম্প্রতি ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। কলামগুলোর বক্তব্য দিয়ে ফটোকার্ডও করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, সম্প্রতি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও সংগঠিত সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয় দেশের শীর্ষ সংবাদমাধ্যম প্রথম আলো ও শীর্ষ ইংরেজি সংবাদমাধ্যম ডেইলি স্টার। গত ১৮ই ডিসেম্বর দিবাগত রাতে সন্ত্রাসীরা কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো ও কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউতে ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। পরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয় কার্যালয় দুটি। মাহফুজ আনামের পুরনো লেখার লিংক ভাইরাল করে হয়তো প্রমাণের চেষ্টা চলছে, তিনি ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের 'দোসর'।

গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, গত ১৮ই ডিসেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ দেশের গণমাধ্যমের ইতিহাসে অন্ধকারময় অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে মব সহিংসতা দমনে সরকার কার্যকর কোনো ভূমিকা নিতে পারেনি এবং তা অব্যাহতভাবে ঘটে চলেছে। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমন মনে হওয়া স্বাভাবিক যে এসব সহিংসতা সরকারের কোনো অংশের প্রশ্রয় পেয়েছে। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের ওপর হামলার সময়ে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকাকে একইভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

সুখবর ডটকম খোঁজ নিলে জানতে পারে, গত বছরের ১৮ই অক্টোবর মাহফুজ আনামের লেখাটি 'হাসিনাস মিসরুল শোড নট অ্যাফেক্ট আওয়ার জাজমেন্ট অব বঙ্গবন্ধু' শিরোনামে প্রকাশিত হয়। ২০২২ সালের ২৩শে ডিসেম্বরে তার লেখা উপসম্পাদকীয়টি 'ফ্রম বঙ্গবন্ধু টু শেখ হাসিনা' শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল।

২০২২ সালের উপসম্পাদকীয়তে মাহফুজ আনাম বলেন, ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসে আওয়ামী লীগের ওপর সবচেয়ে নৃশংস আঘাত হেনে একে অস্তিত্ব সংকটের মুখে ফেলা হয়েছিল। দলের সর্বোচ্চ নেতাকে বর্বরভাবে সপরিবারে হত্যা করা হয়, যাদের মধ্যে তার ১০ বছর বয়সী সন্তানও ছিল। শেখ ও তার বোন তখন বিদেশে থাকায় বেঁচে যান। ৩ মাস পর প্রথম বাংলাদেশ সরকারের (মুজিবনগর সরকার নামে পরিচিত) ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদসহ চার নেতাকে কারাগারে হত্যা করা হয়। এভাবে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হয় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বকে।

তিনি বলেন, জিয়া সরকারের আমলে সবচেয়ে নিন্দনীয় কাজের মধ্যে ছিল বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার এবং জাতীয় চার নেতার স্বঘোষিত খুনিদের দায়মুক্তি দেওয়া, যার সূচনা করেছিল খন্দকার মোশতাক। সম্ভবত এটাই বিশ্বের একমাত্র ঘটনা যেখানে স্বঘোষিত খুনিদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়।

মাহফুজ আনামের মতে, আওয়ামী লীগ একসময় সত্যিকার অর্থেই সবচেয়ে সফলভাবে জনগণের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করেছে। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে–সেটা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যাই হোক না কেন, আওয়ামী লীগ ছিল অগ্রভাগে। মওলানা ভাসানীর হাতে প্রতিষ্ঠিত এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নির্দেশনায় দলটি বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে গৌরব ও চূড়ান্ত সফলতা নিয়ে আসে। বাঙালিদের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করার দিক থেকে গত শতাব্দীর পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে আর কোনো রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ধারেকাছেও ছিল না।

২০২৪ সালের ১৮ই অক্টোবরের কলামে মাহফুজ আনাম বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা ও তাদের অনুসারীদের মধ্যে অনেকেরই ইতিহাস সম্পর্কে নিজস্ব মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে তারা এই দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের প্রতি আমাদের সম্মান থাকবে। কিন্তু, অনেকে হয়তো ষাটের দশকের শেষের দিকের সেসব দিনগুলোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব, ১৯৭০ সালের জাদুকরী মুহূর্ত ও ১৯৭১ সালে আমাদের সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের অসামান্য গুরুত্ব সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নন।

তিনি বলেন, আমরা যারা সেই সময়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছি, তারা একইসঙ্গে সেসব দিনগুলো এবং বঙ্গবন্ধুর ভূমিকার জীবন্ত প্রমাণ। প্রতিদিন মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে নিজেদেরকে উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত করতে আমরা ৭ই মার্চের ভাষণের রেকর্ডিং শুনতাম। আজকের তরুণ প্রজন্ম—যাদের বয়স ১৫ থেকে ৩০ বছর—তারা হয়তো বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জানার চেষ্টা করলে শেখ হাসিনার অপশাসন, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সাড়ে ১৫ বছরের ইতিহাসকেই সামনে পাবে।

মাহফুজ আনাম

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250