ছবি: সংগৃহীত
২০১০ সালে শিক্ষাবিদ অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন সবশেষ প্রণীত হয় জাতীয় শিক্ষানীতি। ১৯৭৪ সালের ড. কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনের সুপারিশের আলোকে ওই শিক্ষানীতিতে কিছু সুপারিশ আছে। সবশেষ প্রণীত শিক্ষানীতিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধের আলোকে শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলা হয়। তবে তা বলা হলেও এর কোনো প্রতিফলন পাঠ্যবইয়ে দেখা যায়নি আওয়ামী লীগের গত সরকারের আমলেও। ওই সরকারের আমলেই সবশেষ শিক্ষানীতি প্রণীত হয়।
অভিযোগ আছে, হেফাজতে ইসলামসহ ধর্মপন্থী রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের বিরোধিতার কারণে এবং ধর্মপন্থীদের কব্জায় রাখায় নীতি অনুসরণ করায় আওয়ামী লীগের সরকার ওই শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করেনি। ২০১৭ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যবই থেকে মুক্তচিন্তার বেশ কিছু প্রবন্ধ, গল্প, কবিতা বাদ দেওয়া হয়। কাজটি করা হয়েছে হেফাজতের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে। এ ব্যাপারে ওই শিক্ষানীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং সরকারের সমর্থক শিক্ষাবিদ ও লেখক-বুদ্ধিজীবী হিসেবে যারা পরিচিত, তাদের প্রবল আপত্তিও উপেক্ষা করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগের আমলে প্রণীত শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের এখনো বিরোধী হেফাজত, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন দল ও সংগঠন। তাদের দাবি, সেটা নাস্তিক্যবাদী শিক্ষানীতি। তবে বিশিষ্ট সাংবাদিক ও ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম মনে করেন, আমাদের (ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার) উচিত ছিল এবং আমাদের সামনে যে বিরল সুযোগটি ছিল (হয়তো এখনো আছে) তা হলো—আগের আটটি শিক্ষা কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক ও বাস্তবসম্মত সুপারিশ বাছাই করা, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে 'ঐকমত্য বৈঠকে' আলোচনা করা এবং একটি অভিন্ন নীতিমালা তৈরি করা—যা অত্যন্ত প্রয়োজন।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক বিভাজন আমাদের জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রে ক্ষতি করেছে। কিন্তু সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে শিক্ষাখাতে। বিশ্বের খুব কম দেশই ৫৪ বছরে আটটি শিক্ষা কমিশন দেখেছে। যদি কমিশনগুলো আগেরটির সুপারিশ ধরে এগোতো, গল্পটা ভিন্ন হতে পারত। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কখনোই ধারাবাহিক সমর্থন পায়নি। সবকিছুর মতো এখানেও সর্বনাশ ডেকে এনেছে দলীয়করণ।
তিনি বলেন, শক্তিশালী, সুসংগঠিত নানা গোষ্ঠী যেকোনো পরিবর্তনের বিরোধিতা করেছে। শিক্ষক সংগঠনগুলো ধারাবাহিকভাবে পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় বিরোধী। কারণ, পরিবর্তন মানেই তাদের নতুন দক্ষতা ও যোগ্যতা প্রয়োজন হবে। প্রায় একই কারণে আমলাতন্ত্রেও ছিল প্রতিশ্রুতির ঘাটতি। বর্তমানে দেশের শিক্ষাখাত দেখভাল করে দুটি মন্ত্রণালয়—প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শিক্ষা আধুনিকায়নে এর কোনোটিরই দক্ষতা, অবকাঠামো কিংবা ইচ্ছাও নেই।
'অ্যা পিকচার দ্যাট ল্যাস বেয়ার দ্য ডিকে অব আওয়ার এডুকেশন সিস্টেম' (যে ছবি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার অবক্ষয় উন্মোচন করে) শিরোনামে লেখা এক উপসম্পাদকীয়তে মাহফুজ আনাম এসব কথা বলেন। তার লেখাটি গতকাল শুক্রবার (২৮শে নভেম্বর) ডেইলি স্টারের ছাপা সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে।
তার দাবি, এই সরকার অনেক ক্ষেত্রেই প্রশংসনীয়ভাবে যে কাজটি করেছে সেভাবে সবচেয়ে জরুরি, প্রাসঙ্গিক ও সর্বজনগ্রাহ্য শিক্ষা সংস্কারের ওপর অধ্যাদেশ জারি করতে পারত। প্রতিটি আধুনিক জাতির সাফল্যের মূলে রয়েছে শিক্ষা। নিয়মিত শিক্ষার আধুনিকায়নের মাধ্যমে দেশের জনগণকে উৎপাদনশীল, উদ্ভাবনী, সমসাময়িক ও সমৃদ্ধ করেছে। এতে একটি জাতি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সমাজবিজ্ঞান, আধুনিক প্রশাসন ও ব্যবসার সব উদ্ভাবনের পূর্ণ ব্যবহার করতে পারে। শিক্ষা সংস্কার না করা মানে একটি জাতিকে স্থবির করে রাখা।
তিনি বলেন, অন্যান্য বিষয়ের মতোই শিক্ষা কমিশনগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নয়, দলীয় রাজনীতির চশমা দিয়ে দেখা হয়েছে। কারণ, কমিশনকে নিরপেক্ষ ও অরাজনৈতিক রাখার কোনো চেষ্টা কখনো হয়নি। নতুন কমিশন গঠনকালে সেই সময়ের সরকার কখনোই বিরোধী দলের প্রতি আস্থা রাখেনি। ফলে পরিবর্তিত সরকারের অধীনে সেই কমিশনের প্রাসঙ্গিকতা থাকেনি। নতুন সরকার পূর্ববর্তী কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন তো দূরের কথা, বরং উল্টো পথে হেঁটেছে।
তার মতে, এভাবে প্রতিবার সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে সুপারিশগুলোও বদলে গেছে। শিক্ষা সংস্কারের ক্ষেত্রে পুরো বিষয়টি দেখা হয়েছে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, আমাদের শিশুদের বা জাতির চাহিদা থেকে নয়। ফলে শিক্ষাব্যবস্থা আধুনিকায়নের জন্য মূল্যবান সময় ও সুযোগ হারিয়ে ফেলেছি।
উপসম্পাদকীয়তে তিনি লেখেন, স্বাধীনতার পর আমরা মোট আটটি শিক্ষা কমিশন পেয়েছি—১. কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন, ১৯৭২; ২. কাজী জাফর আহমদের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী শিক্ষা নীতি, ১৯৭৮; ৩. মজিদ খান শিক্ষা কমিশন, ১৯৮৩; ৪. মফিজ উদ্দিন শিক্ষা কমিশন, ১৯৮৮; ৫. শামসুল হক শিক্ষা কমিশন, ১৯৯৭; ৬. এমএ বারী শিক্ষা কমিশন, ২০০২; ৭. মোহাম্মদ মোনিরুজ্জামান মিয়া শিক্ষা কমিশন, ২০০৩ এবং ৮. কবির চৌধুরীর নেতৃত্বে শিক্ষা নীতি প্রণয়ন কমিটি, ২০০৯। এর বাইরেও গত ৫৪ বছরে আরও বেশ কিছু কমিটি ও নীতি-সংক্রান্ত সংস্থা গঠিত হয়েছে।
তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই শিক্ষা কমিশনগুলো বেসামরিক ও সামরিকসহ বিভিন্ন সরকারের অধীনে গঠিত হয়েছিল। কিন্তু, তারপরও এসব কমিশনের কোনোটারই সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি। এমনকি গুরুত্বপূর্ণ কিছু সুপারিশও কার্যকর করা হয়নি। অথচ, এর পেছনে গিয়েছে বিপুল শ্রম ও সম্পদ। এটি আমাদের কাছে স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, সার্বভৌম দেশ হিসেবে আমাদের অস্তিত্বের অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সামগ্রিকভাবে শিক্ষা, বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাকে আমরা কতটা হালকাভাবে নিয়েছি।
খবরটি শেয়ার করুন