ছবি: মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সৌজন্যে
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় শিখে ঢাকার ওয়ারীর বাসায় ল্যাব বানিয়ে অপ্রচলিত মাদক ‘কুশ’ চাষ করছিলেন তৌসিফ হাসান (২২) নামের এক যুবক। বিদেশে বসে দূরনিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের মাধ্যমে ল্যাবের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি করতেন তিনি। এ কাজে তাকে সহযোগিতা করতেন তার এক বান্ধবী। খবর প্রথম আলোর।
কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে ইয়াবা পাচারের চেষ্টা হচ্ছে, এমন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গাজীপুরের টঙ্গী এলাকায় ফেডেক্স কুরিয়ার সার্ভিসের কার্যালয়ে গতকাল মঙ্গলবার (৬ই জানুয়ারি) অভিযান চালিয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ৩২টি ইয়াবা উদ্ধার করে। সেগুলো যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর জন্য ৩রা জানুয়ারি কুরিয়ার সার্ভিসে বুকিং দেওয়া হয়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, একটি ভুয়া আইডি (পরিচয়) ব্যবহার করে ইয়াবাগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় বসবাসকারী তৌসিফের কাছে পাঠাচ্ছিলেন তার ওই বান্ধবী। কুরিয়ার সার্ভিস কার্যালয়ের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় প্রথমে মেয়েটিকে শনাক্ত করা হয়। ঢাকার খিলগাঁও এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওয়ারী এলাকায় তৌসিফের বাসায় অভিযান চালায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। সেখান থেকে ওই মেয়েকে ইয়াবা এনে দেওয়ার অভিযোগে তৌসিফের বাসার তত্ত্বাবধায়ক মো. রাজু শেখকে (৩৯) গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে টঙ্গী পশ্চিম থানায় একটি মামলা করা হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, অভিযানে তৌসিফের থাকার কক্ষে মাদক ‘কুশ’ (উন্নত জাতের মারিজুয়ানা) চাষের জন্য বানানো একটি ল্যাবের সন্ধান পাওয়া যায়। সেখান থেকে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে আনা ‘কুশের’ বীজ, চাষ করা ‘কুশ’ গাছ, সদ্য তোলা ‘কুশ’, চাষের উপকরণ, সিসা সেবনের উপকরণ ও বিদেশি মদ উদ্ধার করা হয়। পরে বাসার ছাদে টিন ও ফয়েল পেপার দিয়ে বানানো তাপমাত্রানিয়ন্ত্রিত একটি ঘরের মধ্যে অনেকগুলো ‘কুশ’ চাষের টব পাওয়া যায়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক মেহেদী হাসানের নেতৃত্বে এ অভিযান চালানো হয়। তিনি বলেন, তৌসিফ যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। তিনি বছরে কয়েকবার দেশে আসেন। ক্যালিফোর্নিয়া থেকে কুশের বীজ এনে নিজ বাড়িতে চাষ করার জন্য একটি ল্যাব তৈরি করেছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, তৌসিফের বাড়ি ঢাকার ওয়ারী এলাকায়। বাবা মারা যাওয়ার পর তার মা বিয়ে করে চলে গেছেন। তিনি দাদা-দাদির সঙ্গে থাকতেন। ইংরেজি মাধ্যম থেকে ‘ও’ লেভেল শেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পেয়ে সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করেন।
তবে বছরে একাধিকবার দেশে আসেন। ‘ও’ লেভেল পড়ার সময় ওই মেয়ের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হয়। পরে মেয়েটিকে তিনি মাদক পাচারের কাজে ব্যবহার করেন।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, কুরিয়ার সার্ভিসে জমা দেওয়া পার্সেলটি তল্লাশি করে ভেতরে বিশেষ কৌশলে লুকিয়ে রাখা মাদকদ্রব্য অ্যামফিটামিনযুক্ত ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।
ঘটনাস্থল থেকে কুরিয়ার অফিসে উপস্থিত দুই কর্মীকে আটক করা হয়। তারা হলেন ফেডেক্স কুরিয়ার সার্ভিসের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক মো. আব্দুল গাফফার (৩৬) ও কর্মী খুরশিদ আলম (৩৫)। পার্সেলটির বাণিজ্যিক ইনভয়েসে প্রাপকের জায়গায় লেখা হয়—তৌসিফ হাসান, ঠিকানা: ৮২৫ বুশ স্ট্রিট, অ্যাপার্টমেন্ট-৫০১, সান ফ্রান্সিসকো, ক্যালিফোর্নিয়া, যুক্তরাষ্ট্র। প্রেরক হিসেবে ঢাকায় তার এই বান্ধবীর নাম উল্লেখ করা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, আসামিদের নাম-ঠিকানা যাচাই এবং এ চক্রের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত আছে কি না, সে বিষয়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
সুখবর ডটকমের অনুসন্ধান বলছে, ঢাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ২০২২ সালের আগস্টের গোড়ার দিকে এক ব্যক্তিকে আটকের পর জানা যায়, তিনি নিজের বাড়িতেই একটি বিশেষ মাদক তৈরি করে বাজারজাত শুরু করেছিলেন, যা বাংলাদেশেই নতুন। এর আগে বাংলাদেশে এই মাদক ব্যবহারের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। অপ্রচলিত অর্থাৎ নতুন এই মাদকটির নাম কুশ।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ওই সময়ের রাসায়নিক পরীক্ষক ড. দুলাল কৃষ্ণ সাহা গণমাধ্যমে বলেছিলেন, মাদক হিসেবে কুশ বেশি ভয়ংকর ও ক্ষতিকর। এটি একটি সিনথেটিক মারিজুয়ানা, যা বাংলাদেশের প্রচলিত গাজা থেকে অন্তত একশগুণ বেশি শক্তিশালী। ইউরোপ আমেরিকায় এটি মাদকসেবীদের কাছে বেশ জনপ্রিয় হলেও সেখানে এর আছে ভিন্ন ভিন্ন নাম। আর উপমহাদেশে এর পরিচিতি হলো কুশ নামে।
ড. দুলাল কৃষ্ণ সাহা তখন বলেন, হিন্দুকুশ পর্বতমালা পাকিস্তান ও আফগানিস্তান অঞ্চলের একটি দুর্গম ও বিপদসঙ্কুল পর্বত এলাকা এবং কুশ মাদকে ব্যবহৃত গাজার চাষ বেশি হয় এই অঞ্চলে। হিন্দুকুশ পর্বতমালা যেমন বৈরী, বিপদসঙ্কুল আর ভয়ংকর, এই কুশ মাদকটিও তেমনই ভয়ংকর। এ মাদকের প্রতিক্রিয়া অনেক বেশি। এটি সেবন করলে কোনো বোধশক্তি থাকে না এবং নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা যায় না। অন্য মাদকের চেয়ে দ্রুতগতিতেই লিভার ও কিডনি বিকল করে দিতে পারে কুশ নামের এই মাদকটি।
প্রসঙ্গত, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের হিসাবে দেশে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩৬ লাখ এবং সবচেয়ে বেশি মাদক ব্যবহারকারী আছেন ঢাকা বিভাগে। যদিও বেসরকারি হিসাবে মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৭০ লাখের কাছাকাছি বলে দাবি করে বিভিন্ন সংস্থা। তাদের বিরাট অংশের মধ্যে জনপ্রিয় মাদক হলো ইয়াবা।
খবরটি শেয়ার করুন