সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবু ও শ্যামল দত্ত। ফাইল ছবি
দেশে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা ও হয়রানির অভিযোগ নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সাংবাদিক ও গণমাধ্যম নিপীড়নের ঘটনাগুলো অতীতের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যায়। একাধিক সূত্র ও সাংবাদিক সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের অন্তত ২৯৮ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে।
এসব মামলার প্রকৃতি, উদ্দেশ্য এবং সাংবাদিকদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে এখন রাজনৈতিক ও পেশাগত মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে। বিশেষ করে, বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকারের যাত্রার শুরুতে কারাবন্দী ও মামলার শিকার সাংবাদিক এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা আশাবাদী হয়ে উঠেছেন যে, নির্বাচিত সরকারের আমলে এসব মামলা থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। কারাবন্দীদের মুক্তি মিলবে।
তবে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের মামলার বিষয়ে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের অবস্থান নিয়েও আলোচনা চলছে। সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ক্ষমতায় থাকাকালে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন, এমন সাংবাদিকদের মামলার ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান নরম হবে না। যাদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সরকারের আমলে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে আর্থিক দুর্নীতির জোরালো অভিযোগ আছে, তাদের মামলার বিষয়েও সরকার নরম অবস্থান দেখাবে না।
বিএনপির নীতিনির্ধারকদের মতে, সাংবাদিকতার আড়ালে কোনো দলের পক্ষে রাজনৈতিক প্রচারণা চালানো হলে সেটিকে পেশাগত কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। তাদের দাবি, যারা সরাসরি অতীতে আওয়ামী লীগের দলীয় রাজনীতিতে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সেটি আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যেই নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। তাছাড়া এসব মামলা বিএনপির সরকারের আমলে দায়ের করা নয়। এই প্রেক্ষাপটে মামলাগুলো নিয়ে বিভিন্ন পক্ষ ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছে।
বিএনপির ঘনিষ্ঠ কয়েকজন বিশ্লেষক সুখবর ডটকমকে বলছেন, গত দেড় দশকে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গণমাধ্যমের একটি অংশ দলীয় প্রচারণার যন্ত্রে পরিণত হয়েছিল—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে উঠে আসছে। তাই এখন সেই বিষয়টি পুনর্মূল্যায়নের দাবি উঠেছে।
তবে সব সাংবাদিকের ক্ষেত্রে একই নীতি প্রয়োগ করা হবে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। যেসব সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে, কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে দলীয় পদ বা সরাসরি রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও দুর্নীতির অভিযোগ নেই, তাদের বিষয়ে সরকার আলাদা প্রক্রিয়া বিবেচনা করছে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর বিষয়ে সরকারের অবস্থান আরও পরিষ্কার হবে বলে সূত্রগুলোর ধারণা।
এই প্রেক্ষাপটে তথ্য মন্ত্রণালয় একটি বিশেষ পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠনের পরিকল্পনা করছে বলে জানা গেছে। আসন্ন ঈদুল ফিতরের পর কমিটি গঠন হতে পারে। এই কমিটি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলো পর্যালোচনা করবে এবং কোনগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা ভিত্তিহীন—তা নির্ধারণ করার চেষ্টা করবে। তথ্য মন্ত্রণালয়ের সম্ভাব্য পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠন হলে অনেক মামলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ হতে পারে।
সাংবাদিক সংগঠনগুলোর দেওয়া তথ্যের বিশ্লেষণ বলছে, ড. ইউনূস সরকারের আমলে মামলার শিকার সাংবাদিকদের মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশের সঙ্গে সাবেক আওয়ামী লীগের সরকারের সরাসরি সম্পর্ক ছিল। কেউ দলটির প্রচারণায় সক্রিয় ছিলেন, কেউবা আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন বা স্থানীয় রাজনীতির পদে ছিলেন। এ কারণে এসব মামলার বিচার ও পর্যালোচনার ক্ষেত্রে নতুন সরকারের অবস্থান কী হবে—তা নিয়ে শুরুতেই নানা প্রশ্ন উঠেছে।
সাংবাদিক ইউনিয়ন ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাব অনুযায়ী, ২৯৮ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার মধ্যে অনেকগুলোই হত্যা বা রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগে দায়ের হয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বা ব্যক্তিগত বিরোধ থেকেও সাংবাদিকদের মামলায় জড়ানো হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, মামলার তালিকায় থাকা সাংবাদিকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ এমন, যারা অতীতে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত ছিলেন। এই সম্পৃক্ততার ধরনও বিভিন্ন রকম। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই সাংবাদিকদের মধ্যে কয়েকটি শ্রেণি রয়েছে—যেমন, দলীয় প্রচারণায় সরাসরি অংশগ্রহণকারী সাংবাদিক; অনেক সাংবাদিক অতীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা টেলিভিশন টকশোতে আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রকাশ্যে প্রচারণা চালিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
দলীয় বা সহযোগী সংগঠনের পদধারী সাংবাদিক—কিছু সাংবাদিক স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগ বা এর সহযোগী সংগঠনের পদে ছিলেন। উদাহরণ হিসেবে ছাত্রলীগ, যুবলীগ বা সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা বলা হচ্ছে। দলীয় মিডিয়া সেলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা—কয়েকজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে, তারা আওয়ামী লীগের প্রচার কৌশলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বা দলীয় মিডিয়া সেলের অংশ হিসেবে কাজ করেছেন।
গণমাধ্যম বিশ্লেষকেরা মনে করেন, সাংবাদিকদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার প্রশ্নটি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। তাদের মতে, দেশে দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকতা ও রাজনীতির মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিকেরা সরাসরি রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েছেন। কিন্তু পেশাগতভাবে এটি দীর্ঘমেয়াদে গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য ক্ষতিকর। যদি কোনো সাংবাদিক সরাসরি দলীয় পদে থাকেন, তাহলে তাকে সাংবাদিক হিসেবে নয়—রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে বিবেচনা করার যুক্তি তৈরি হয়।
২০২৪ সালে আন্দোলন চলাকালে ২৬শে জুলাই ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে কয়েক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক তাকে আন্দোলন আরও কঠোর হাতে দমনে উৎসাহ দেন। অনেকে মনে করেন, তারা সাংবাদিক হিসেবে নন, রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে সেদিন কাজ করেছিলেন।
এছাড়া নারায়ণগঞ্জের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের অনুসারীরা যখন ছাত্রদের উপর গুলি চালাচ্ছিলেন জুলাই-আগস্টে, তখন একটি ভিডিওতে দেখা যায় যে, স্থানীয় দু'জন সাংবাদিক শামীম ওসমানের সঙ্গে একটি মিছিলে ছিলেন। একজন সাংবাদিককে দুই হাতে দু'টি আগ্নেয়াস্ত্র বহন করতেও দেখা গেছে ওই ভিডিওতে।
বিভিন্ন জেলার এমন সাংবাদিক, যারা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সুবিধাভোগী ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে। জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে মামলা হওয়া কয়েক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের গত সরকারের আমলে আর্থিক সুবিধা নেওয়ারও অভিযোগ আছে।
তবে ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান মনে করেন, 'অভিযুক্ত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনার যথেষ্ট যুক্তিসংগত কারণ অবশ্যই থাকতে পারে। আওয়ামী লীগের শাসনামলে তারা এমন এক সরকারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যে সরকার বিরোধী দল দমন করেছে, নির্বাচনে জালিয়াতি করেছে, গুম করেছে, সংবাদমাধ্যমকে চুপ করিয়ে রেখেছে ও রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে অন্যায়ভাবে মানুষকে আটক রেখেছে। তবু রাজনৈতিক আনুগত্য কিংবা কোনো কর্তৃত্ববাদী শাসনের কট্টর সমর্থক বা প্রচারক হওয়াটাই অপরাধ নয়।'
অন্যদিকে মানবাধিকার কর্মীরা সতর্ক করে বলছেন, নতুন সরকারের সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অতীতের মামলা পর্যালোচনার ক্ষেত্রে যেন রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কাজ না করে। তাদের মতে, প্রতিটি মামলা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
সাংবাদিক সংগঠনগুলো বলছে, মামলার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সুখবর ডটকমকে বলেন, সাংবাদিক যদি অপরাধ করে থাকেন, অবশ্যই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কিন্তু শুধু রাজনৈতিক মত বা সংবাদ প্রকাশের কারণে মামলা হলে সেটি গণতন্ত্রের জন্য ভালো নয়। তিনি আরও বলেন, অতীতে বিভিন্ন সরকার সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইন ব্যবহার করেছে—এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি।
এদিকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম অধিকার সংগঠনগুলোও বাংলাদেশের পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে। তারা বলছে, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তার গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে।
বিশেষজ্ঞেরা মনে করেন, দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে সহনশীল হতে হবে এবং সাংবাদিকদেরও পেশাগত নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে।
বাংলাদেশে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া ২৯৮টি মামলা এখন শুধু আইনি বিষয় নয়; এটি রাজনৈতিক, পেশাগত এবং নৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। একদিকে রয়েছে সাংবাদিকতার স্বাধীনতার প্রশ্ন, অন্যদিকে রয়েছে পেশাগত নিরপেক্ষতা ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিতর্ক। গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, দেশের সাংবাদিকতার স্বাধীনতা অনেকটাই নির্ভর করবে, এই বিতর্কের সমাধান কীভাবে করা হয় তার ওপর।
খবরটি শেয়ার করুন