ছবি: সংগৃহীত
এক-এগারোয় সেনা সমর্থিত সরকার ক্ষমতা দখলের পর বাংলাদেশের কিছু প্রধান পত্রিকা বিএনপি ও দলটির নেতাদের বিরুদ্ধে সুপরিকল্পিত প্রোপাগান্ডা শুরু করে। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনাকে পরিকল্পিতভাবে ক্ষমতাসীন করার পর এসব সংবাদপত্রে বিএনপিবিরোধী অপপ্রচারের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়।
খালেদা জিয়াকে অবৈধ কর্মকাণ্ডের মদতদাতা, তারেক রহমানকে ‘পলাতক অপরাধী’ হিসেবে উপস্থাপন করা হতো, যেখানে সত্যতার চেয়ে রাজনৈতিক বিষয়ই প্রাধান্য পেত। তবে সময়ের সঙ্গে সুরও বদলায়; যারা এক সময় বিএনপির বিরুদ্ধে লিখতেন, আজ তারা ভিন্ন সুরে কথা বলছেন।
দৈনিক আমার দেশের প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। পত্রিকাটির এই প্রতিবেদনের লিংক ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। নানা শ্রেণি-পেশার নেটিজেনদের মধ্যে প্রতিবেদনের বক্তব্য নিয়ে নানামুখী আলোচনা চলছে। আমার দেশের ছাপা সংস্করণে প্রতিবেদনটি আজ সোমবার (১২ই জানুয়ারি) 'পত্রিকার সেকাল-একাল' শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে।
আমার দেশের প্রতিবেদনে গত আওয়ামী লীগের সরকারের আমলে প্রকাশিত দৈনিক প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, জনকণ্ঠ ও বাংলাদেশ প্রতিদিনের আলোচিত কয়েকটি প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
পত্রিকাগুলোর এ ধরনের ভূমিকা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটিতে সংবাদের সমাজতত্ত্ব বিষয়ে গবেষণারত তাইয়িব আহমেদ আমার দেশকে বলেন, “এর প্রধান কারণ বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলোর পলিটিক্যাল প্যারালেলিজম অর্থাৎ তাদের অধিকাংশই কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কমবেশি সম্পৃক্ত।
দ্বিতীয়ত, মিডিয়া হাউসগুলোর অর্থনৈতিক কাঠামো ও প্রয়োজনীয়তাও একটি বড় কারণ। মূলত এ দুই কারণে তাদের সংবাদ উপস্থাপন প্রায়ই একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষের অনুকূলে ঝুঁকে পড়ে। ফলে অনেক সময় তারা সাংবাদিকতার বস্তুনিষ্ঠতার নীতি লঙ্ঘন করে এবং ‘জার্নালিস্টিক পাওয়ার’-এর অপব্যবহার করে।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের গণমাধ্যমের এই একাল-সেকালের গল্প আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তের ইতিহাস নয়; এটি ক্ষমতা, রাজনীতি ও অর্থনৈতিক নির্ভরতার এক গভীর কাঠামোগত সংকটের প্রতিচ্ছবি। যে পত্রিকাগুলো এক সময় বিরোধী রাজনীতিকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’, ‘সন্ত্রাস’ ও ‘অনৈতিকতা’র প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছিল, সময়ের পরিবর্তনে তারাই আবার ভিন্ন ভাষায় একই রাজনৈতিক শক্তিকে গণতন্ত্রের আশা হিসেবে হাজির করেছে। এই রূপান্তর প্রমাণ করে—বাংলাদেশে বেশিরভাগ গণমাধ্যম এখনো ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভাষা বদলায় কিন্তু নৈতিক অবস্থান বদলায় না।
আমার দেশের প্রতিবেদনে কয়েকটি উদাহরণ পাঠকের সামনে তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, এগুলো শুধু ইতিহাস নয়, বাংলাদেশের সাংবাদিকতার অন্তর্নিহিত দ্বিচারিতা ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক প্রভাবের জীবন্ত দলিল।
২০০৭-০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় প্রথম আলোর পাতায় পাতায় বিএনপি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা শুরু হয়। খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে লক্ষ্য করে বিতর্কিত প্রতিবেদন প্রকাশ হতে থাকে। ২০০৭ সালের ৩ জুন ‘খালেদার সম্মতিতে বসুন্ধরার কাছে ১০০ কোটি (টাকা) চেয়েছিলেন তারেক’ শিরোনামের প্রতিবেদন পাঠক মনে গভীর সংশয় সৃষ্টি করে।
এরপর ‘দ্বিতীয় মেয়াদে খালেদা জিয়া বেপরোয়া হয়ে পড়েন’ শিরোনামে সাবেক একান্ত সচিব নুরুল ইসলামের সাক্ষাৎকার প্রামাণ্য দলিল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
২০০৭ সালের ৪ঠা জুন প্রথম আলোতে ‘বিএনপির দুর্নীতি দুর্বৃত্তপনা’ শিরোনামের সম্পাদকীয়তে লেখা হয় ‘একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি তার সব শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। এর প্রধান দায় দলের শীর্ষ নেত্রী খালেদা জিয়ার। কারণ তিনি ছিলেন নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী। তার অবগতির বাইরে কোনো কিছুই ঘটেনি, ঘটা সম্ভব ছিল না।
তিনি তার দুই ছেলে, এক ভাই, বোন, দুই ভাগনে ও ভয়ঙ্কর নীতিহীন কিছু চাটুকার নেতাকে নিয়ে এমন এক চক্র গড়ে তুলেছিলেন, যেটাকে রাজনৈতিক দল বলে স্বীকার করা যায় না, দুর্বৃত্তচক্র বললেই সঠিক হয়। তাদের সবার যথাযথ বিচার হতে হবে।’
২০১৩-২১ পর্যন্ত প্রথম আলোর রিপোর্ট ও কলামে বিএনপিকে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, দুর্নীতি ও ইতিহাস বিকৃতির সঙ্গে যুক্ত দেখানোর চেষ্টা করা হয়। ২০১৭ সালের ২৫শে অক্টোবর ‘তারেক হামলাকারীদের আশ্বাস দিয়েছিলেন’ এবং ২০১৪ সালের ২২শে আগস্ট ‘গ্রেনেড হামলায় খালেদা-তারেক জড়িত’ শিরোনামে তাদের সরাসরি অপরাধী হিসেবে দেখানো হয়। কলামে ‘নৈতিকভাবে তারেকও দণ্ডিত’ (২০১৩) ও ‘তারেক রহমানের অভিনব রাষ্ট্রপতিতত্ত্ব’ (২০১৪) শিরোনামে চরিত্র হনন ও জাতীয়তাবাদী ভাবমর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা করা হয়।
২০২১ সালের ২৪ জুন ‘তারেকের নেতৃত্বে বিএনপি দাঁড়াতে পারছে না’ প্রতিবেদনে দলকে দিশাহীন ও অকার্যকর দেখানো হয়। ২০১৬ সালের ২১শে আগস্ট কলামে বিএনপিকে জঙ্গিবাদের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
বিএনপির বিরুদ্ধে প্রথম আলোর কভারেজে ব্যবহৃত পাঁচটি কৌশল ছিল— সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদে সংযোগ, নৈতিক দোষারোপ ও চরিত্রহনন, ইতিহাস বিকৃতি, নেতৃত্বের দুর্বলতা প্রচার এবং ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা। এর মাধ্যমে বিএনপিকে অগ্রহণযোগ্য ও অনৈতিক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে।
খবরটি শেয়ার করুন