ছবি: সংগৃহীত
প্রায় দেশজুড়ে হামের প্রকোপ বাড়ছে। বর্তমানে হাম আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৯০ শতাংশই নিউমোনিয়ায় ভুগছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এই তথ্য চিকিৎসকদের। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে হামের সংক্রমণ বাড়তে থাকায় শিশুস্বাস্থ্যে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
গতকাল রোববার সন্ধ্যার পর মহাখালীর জাতীয় সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ষষ্ঠ তলার করিডরে শয্যা সংকটের কারণে মেঝেতেই পাশাপাশি রাখা হয়েছে একাধিক বিছানা। সেখানে চিকিৎসাধীন প্রতিটি শিশুই হাম আক্রান্ত, আর তাদের অধিকাংশই নিউমোনিয়ায় ভুগছে। অসুস্থ শিশুদের পাশে উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন অভিভাবকেরা।
এমনই এক শিশু মুয়াজ, বয়স মাত্র ছয় মাস। তার মা শিরিনা বেগম জানান, ঈদের আগেই ছেলের জ্বর, সর্দি-কাশি শুরু হয়। পরে শরীরে লাল ফুসকুড়ি দেখা দিলে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হলে হাম ধরা পড়ে। কয়েক দিন চিকিৎসার পর অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়।
বর্তমানে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ভর্তি থাকলেও শয্যা না পেয়ে করিডরেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। হামের লক্ষণ কিছুটা কমলেও নিউমোনিয়া, জ্বর ও কাশি এখনও পুরোপুরি সারেনি।
চিকিৎসকেরা বলছেন, হাম মূলত একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়। ফলে সহজেই ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ হয়ে নিউমোনিয়া দেখা দেয়।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের চিকিৎসক ডা. এএসএম মাহমুদুজ্জামান সুখবর ডটকমকে জানান, নিউমোনিয়া হলে শিশুর শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায় এবং শ্বাসকষ্ট বাড়ে। অনেক ক্ষেত্রে আইসিইউ বা ভেন্টিলেটর সহায়তা প্রয়োজন হয়। সাধারণ নিউমোনিয়ার তুলনায় হামজনিত নিউমোনিয়ায় এই ঝুঁকি দ্বিগুণ পর্যন্ত হতে পারে।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. শ্রীবাস পাল বলেন, হামের শুরুতে জ্বর, সর্দি-কাশি থাকে। কয়েক দিনের মধ্যে শরীরে র্যাশ দেখা দেয়। তবে দ্বিতীয় সপ্তাহে রোগ জটিল আকার নেয়।
তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, হাম আক্রান্তদের মধ্যে ৯০ শতাংশের নিউমোনিয়া, ৬০–৭০ শতাংশের ডায়রিয়া এবং প্রায় অর্ধেকের চোখের প্রদাহ বা কনজাংক্টিভাইটিস হয়।
বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, হামের সংক্রমণ ক্ষমতা অত্যন্ত বেশি। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি ১২ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারেন, যা অনেক ভাইরাসজনিত রোগের তুলনায় বেশি।
ঢাকার একটি শীর্ষ সরকারি হাসপাতালের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. লুৎফুন্নেসা বলেন, হামের নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই; বরং এর জটিলতাগুলোর চিকিৎসাই মূল ভরসা। নিউমোনিয়ার পাশাপাশি এনসেফালাইটিসের মতো গুরুতর জটিলতাও হতে পারে, যা জীবনঝুঁকি তৈরি করে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারও তৎপর হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন গতকাল সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, হামের টিকা সংগ্রহে জরুরি ভিত্তিতে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিভাগীয় শহরগুলোতে আইসিইউ সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ হলো এমএমআর টিকা। নির্ধারিত সময়ে শিশুদের টিকা নিশ্চিত করলে এই রোগ থেকে সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব। টিকাটি নিরাপদ এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া খুবই সামান্য।
সার্বিকভাবে, হামের বিস্তার ও তার জটিলতা—বিশেষ করে নিউমোনিয়ার উচ্চ হার—শিশুস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই দ্রুত টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা এবং আক্রান্তদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করাই এখন অভিভাবকদের দাবি।
জে.এস/
খবরটি শেয়ার করুন