ফাইল ছবি
দেশের তরুণেরা বলছেন, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগকে তারা ভোট দিতে চান। বছরের পর বছর ধরে দলের স্বৈরাচারী আচরণ এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত সহিংসতা ঘটবার পরও আওয়ামী লীগকে তারা ভোট দিতে আগ্রহী। দলটি এখনো উল্লেখযোগ্য সমর্থন ধরে রেখেছে। কৌশলগত জোট না করলে নবগঠিত দল এনসিপির জাতীয় সংসদে একটি আসন পাওয়াও খুবই কঠিন হয়ে যাবে।
আওয়ামী লীগকে নিয়ে চারদিকে সমালোচনা, সামাজিকভাবে নিন্দা এবং তাদের কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়া আইনত অপরাধ বলে যখন নির্ধারিত হয়েছে, তখনো এই সমর্থন দেখা যাওয়ায় বিশেষজ্ঞেরা মনে করছেন, দলটির মৌলিক সমর্থকগোষ্ঠী এখনো টিকে আছে। অর্থাৎ আওয়ামী লীগের মূল ‘সমর্থক–ঘাঁটি’ পুরোপুরি ভেঙে যায়নি; বরং অনেকটা স্থায়ীভাবেই টিকে আছে।আওয়ামী লীগ প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে না থাকায় বিএনপির সমর্থনও কমে এসেছে।
আওয়ামী লীগ আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে না, বা অংশ নেবে না। এ কারণে ৫৬ শতাংশ তরুণ বলেছেন, তারা ভোট দেবেন না। এখনো ৪১ শতাংশ সাবেক আওয়ামী লীগ ভোটার সিদ্ধান্তহীন অবস্থায় আছেন। ১৮ শতাংশ তরুণ তাদের পছন্দের কথা জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এই গ্রুপের মধ্যে এমন বহু ‘নীরব’ আওয়ামী লীগ সমর্থক থাকতে পারেন, যারা প্রকাশ্যে নিজেদের মতামত বলেন না।
বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টারের (বিওয়াইএলসি) পরিচালিত যুব জরিপের ফল বিশ্লেষণ করে উপরের কথাগুলো বলেছেন ব্রিটিশ সাংবাদিক ও কলামিস্ট ডেভিড বার্গম্যান। জরিপে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জনসমর্থনের চিত্র ওঠে এসেছে। তবে বার্গম্যানের বিশ্লেষণে জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রসঙ্গে কিছু বলা হয়নি।
জরিপে দেখা গেছে, বিএনপি ও জামায়াত শীর্ষস্থান দখলের জন্য লড়ছে। কিন্তু এই দুই দলের কেউই নিরঙ্কুশ সমর্থন তৈরি করতে পারছে না। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের টিকে থাকা সমর্থক, সেই সঙ্গে সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের বড় সংখ্যা থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখনো পরিবর্তনশীল।
ডেভিড বার্গম্যান বলেন, কিছুটা অবাক করার মতো বিষয় হলেও জরিপে অংশ নেওয়া তরুণেরা বলেছেন, তারা আওয়ামী লীগকে ভোট দিতে চান। বর্তমান পরিস্থিতিতে যখন আওয়ামী লীগকে নিয়ে চারদিকে সমালোচনা, সামাজিকভাবে নিন্দা এবং তাদের কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়া আইনত অপরাধ নির্ধারিত হয়েছে, তখনো এই সমর্থনে দেখা যাচ্ছে যে, দলটির মৌলিক সমর্থকগোষ্ঠী এখনো টিকে আছে। অর্থাৎ আওয়ামী লীগের মূল ‘সমর্থক–ঘাঁটি’ পুরোপুরি ভেঙে যায়নি; বরং অনেকটা স্থায়ীভাবেই টিকে আছে।
উল্লেখ্য, এই জরিপ করা হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হবার আগে। চব্বিশের জুলাই-আগস্টে অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ তাদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন গত ১৭ই নভেম্বর।
বার্গম্যান জরিপের ফল উল্লেখ করে বলেন, বিএনপির জন্য মাত্র ২০ শতাংশ সমর্থন হতাশাজনক। আওয়ামী লীগ প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে না থাকায় বিএনপির সমর্থনও কমে এসেছে। অনেকে ধারণা করেছিলেন, আওয়ামী লীগের পতনে সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হবে বিএনপি। দলটি ঐতিহাসিকভাবে জাতীয় ভোটের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণ করে বলে মনে করা হয় এবং অনেক বিশ্লেষক মনে করতেন, আওয়ামী লীগের স্বৈরাচারী প্রবণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিএনপির সমর্থনও বেড়ে গেছে।
ডেভিড বার্গম্যান দাবি করেন, শেখ হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীর উত্থান একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে সামনে এসেছে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানকে সমর্থন করা এবং যুদ্ধাপরাধে জড়িত থাকার কারণে যে সামাজিক বদনাম তাদের ছিল ছিল, তা অনেকটাই কমে গেছে বলে মনে হচ্ছে। নিজেদের ‘মধ্যপন্থী’ ধর্মীয় দল হিসেবে পুনর্গঠনের প্রচেষ্টাও কিছুটা সফল হয়েছে। তবে মাত্র ১৭ শতাংশ সমর্থন তাদের ব্যাপক জনসমর্থন অর্জন থেকে এখনো অনেক দূরে রেখেছে।
দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক উপসম্পাদকীয়তে ডেভিড বার্গম্যান এসব কথা বলেন। 'বিএনপি ও জামায়াতের পার্থক্য কম, অনিশ্চিত ভোটার বেশি' শিরোনামে তার লেখাটি আজ মঙ্গলবার (২৫শে নভেম্বর) প্রকাশিত হয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন বাংলাদেশ বিষয়ে লেখালেখি করছেন। প্রথম আলো ও ইংরেজি পত্রিকা ডেইলি স্টারে তার লেখা প্রায় নিয়মিত প্রকাশিত হয়।
প্রথম আলোর আজকের উপসম্পাদকীয়তে তিনি জানান, গত ১০ই থেকে ২৫শে অক্টোবরের মধ্যে চালানো বিএলওয়াইসির যুব জরিপে ২,৫৪৫ জন অংশ নেন। দেশের ভৌগোলিক ও জনমিতিক বৈচিত্র্য প্রতিফলিত করার জন্য ‘র্যান্ডম স্যাম্পলিং’ পদ্ধতিতে তাদের নির্বাচন করা হয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশে জরিপকে মানুষ সাধারণত সন্দেহের চোখে দেখে। এমনকি সেগুলো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে করা হলেও লোকের সন্দেহ যায় না।
তিনি বলেন, অনেকের যুক্তি হলো, মাত্র হাজার কয়েক লোকের উত্তর দিয়ে বাংলাদেশের জনগণের জটিলতাকে পুরোপুরি তুলে ধরা সম্ভব নয়। এ ছাড়া নাগরিকেরা অপরিচিত মানুষের কাছে তাদের আসল রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দ প্রকাশ করতে চান না। সাধারণভাবে জরিপের ফল নিয়ে কিছুটা সন্দেহ থাকাটা ঠিক আছে। কারণ, জরিপ সব সময় শতভাগ নির্ভুল হয় না। কিন্তু যদি আপনি জরিপকে একেবারে গুরুত্বই না দেন, তাহলে সেখানে যে গুরুত্বপূর্ণ সংকেত বা তথ্য পাওয়া যেতে পারে সেগুলো দেখাই হবে না।
তার মতে, বিশেষ করে গত আওয়ামী লীগের সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর যেসব জরিপ হয়েছে, সেগুলো একটার পর একটা প্রায় একই রকম ফল দেখাচ্ছে। তাই সব জরিপকে অগ্রাহ্য করলে এই ধারাবাহিক তথ্যগুলো বোঝার সুযোগও হারিয়ে যেতে পারে। নিজের লেখায় তিনি বিওয়াইএলসির যুব জরিপের ছয়টি মূল বিষয় তুলে ধরেন। জরিপের একটি উল্লেখযোগ্য তথ্য হলো—যুবসমাজের মধ্যে ভোট দেওয়ার প্রবল ইচ্ছা রয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া তরুণদের মধ্যে ৯০ শতাংশই জানিয়েছেন, তারা নিবন্ধিত ভোটার।