ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান গতকাল শনিবার পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন থেকে বিতর্কের মুখে পড়েছেন একটি ভিডিও নিয়ে। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে, তিনি ঢাকায় কর্মরত বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়কালে হৃদ্যতার সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছেন এবং খুনসুটিতে মেতে উঠেছেন। একপর্যায়ে ওই কূটনীতিককে তিনি হৃদ্যতার সঙ্গে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরেন।
বিষয়টি নিয়ে অনেকে নানা ট্রল করছেন। দেশে জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমানকে নিয়ে এভাবে ব্যক্তিগত ট্রল করার মতো ঘটনা অতীতে দেখা যায়নি। বিদেশি কূটনীতিককে জড়িয়ে ধরায় অনেকে বিষয়টিতে তথাকথিত সমকামিতার ইঙ্গিত দেখছেন। তবে অনেকে বলছেন, বিরোধীদলীয় নেতার বিদেশি কূটনৈতিকদের সঙ্গে ঈদশুভেচ্ছা বিনিময়কে কেন্দ্র করে সামাজিক মাধ্যমে নোংরা মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে।
তাদের প্রশ্ন, শফিকুর রহমান কি এমন কিছু ঘটিয়েছেন, যা নিয়ে একশ্রেণির নেটিজেনের অসুস্থ রাজনীতিতে পড়ে থাকতে হবে? রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু মিথ্যা নিয়ে মানুষকে ট্রল করতে ঝাঁপিয়ে পড়া—এটা অসুস্থ রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ। শফিকুর রহমান একজন মিশুক প্রকৃতির মানুষ। যেকোনো জাতি বা গোষ্ঠীর মানুষের সঙ্গে সহজেই সম্মানের সঙ্গে মিশতে পারেন তিনি।
ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়
গতকাল শনিবার (২১ মার্চ) দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে কূটনীতিকদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন শফিকুর রহমান। এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, ভারত, জাপান, ব্রুনেই, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ইরান, পাকিস্তান, নেপাল, নেদারল্যান্ডস ও ভুটানের রাষ্ট্রদূত–হাইকমিশনাররা। উপস্থিত ছিলেন তাদের পরিবারের সদস্যরাও।
শুভেচ্ছা বিনিময়ের পাশাপাশি অনুষ্ঠানে ইউনিসেফ ও ইউএন ওমেন বাংলাদেশের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানটি ছিল আনুষ্ঠানিক হলেও, সামাজিক ও মানবিক আঙ্গিকেও হৃদ্যতাপূর্ণ বলে অনেকে মনে করছেন।
ভিডিওতে দেখা দৃশ্য
সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, শফিকুর রহমান অতিথিদের সঙ্গে আড্ডা ও খুনসুটি করছেন। ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি অনেকের সঙ্গে কোলাকুলি করেছেন, কারও কপালে চুমু দিয়েছেন এবং খাবার টেবিলে বসা এক কূটনীতিককে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরেছেন। কূটনীতিকেরাও স্পষ্টভাবে আনন্দিত ছিলেন এবং এই মুহূর্তটি উচ্ছ্বাসের সঙ্গে উপভোগ করেছেন।
তবে ভিডিওটি ভাইরাল হতেই নেটিজেনদের মধ্যে বিভাজন দেখা দিয়েছে। অনেকে বিষয়টিকে ট্রল বা তীর্যক মন্তব্যের মাধ্যমে উপস্থাপন করছেন, আবার অনেকে এটিকে নিছক প্রাণবন্ত আড্ডা ও খুনসুটি হিসেবে দেখছেন।
নেটিজেনদের প্রতিক্রিয়া
নেটিজেনদের একাংশ বলেছেন, বিষয়টিতে নেতিবাচক কিছু নেই। একজনকে জড়িয়ে ধরার মধ্যেই হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্কের প্রকাশ ঘটে। ধর্মীয়, আইনি বা সামাজিক- কোনো দৃষ্টিকোণ থেকেই বিষয়টি সমালোচনাযোগ্য নয়।
কিছু মন্তব্যে এও উল্লেখ করা হয়েছে যে, যাদের সমালোচনা সাধারণত জামায়াতের বিরুদ্ধে হয়ে থাকে, তারা এই ঘটনায় শফিকুর রহমানের বিরুদ্ধে অযাচিত সমালোচনা করছেন। বিশেষভাবে, কেউ কেউ বিদেশি কূটনীতিককে জড়িয়ে ধরার মধ্যে তথাকথিত সমকামিতার ইঙ্গিত খুঁজছেন, যা সামাজিকভাবে অশ্লীল ব্যাখ্যা হিসেবে দেখানো হচ্ছে।
আশ্চর্যের হচ্ছে, যেসব প্রগতিশীল চিন্তার নেটিজেন জামায়াতের ইসলামীর সমালোচনা করেন দলটির ধর্মীয় মতাদর্শের কারণে, তারাও এখন জামায়াত আমিরের সমালোচনা করছেন সামাজিক মাধ্যমে। এতে তাদের দ্বিচারিতার প্রকাশ ঘটছে। কারণ, প্রগতিশীলেরা সমকামিতার অধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে থাকেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, প্রগতিশীল সমাজে সমকামিতা বৈধ, এবং এটি কোনো অসদাচরণ হিসেবে গণ্য করা হয় না। যদিও বাংলাদেশে সমকামিতা অবৈধ এবং মুসলমান জনসংখ্যা অধ্যুষিত দেশগুলোতে সমকামিতার বৈধতা সাধারণত নেই।
তাছাড়া, বিরোধী দলীয় নেতার কূটনীতিককে জড়িয়ে ধরার মধ্যে কোনো অশ্লীল ইঙ্গিত নেই। এটা আন্তরিকতাপূর্ণ সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। এর মধ্য দিয়ে শফিকুর রহমান বিরুদ্ধে অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রত্যাশিত সমালোচনা চলছে।
অনেক নেটিজেন বলছেন, ভিডিওতে ঘটনাটি একটু খেয়াল করলে দেখা যায়—শফিকুর রহমান উপস্থিত প্রায় সব কূটনীতিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার চেষ্টা করেছেন। টেবিলের সামনের দিকে মুখ করে থাকা কূটনীতিবিদদের সঙ্গে কিছুটা আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এবং কূটনীতিবিদদের ব্যক্তিগত আগ্রহের কারণে তিনি অনেকের সঙ্গে কোলাকুলি করেছেন।
তাদের মতে, চেয়ার সেটিং এবং পরিবেশের কারণে হয়তো সবার সঙ্গে সামনাসামনি কোলাকুলি করা কষ্টসাধ্য ছিল। যাদের সঙ্গে কোলাকুলি করেছেন শফিকুর রহমান, তারা ভালোভাবে এটাকে গ্রহণ করেছেন। ফেসবুক দুনিয়ায় বিষয়টি কথিত 'উল্টাপাল্টা হয়ে গেল!
জামায়াতের অবস্থান
জামায়াতের নেতারা বিষয়টিকে স্বাভাবিক ও সাধারণ ঈদের আনন্দের অংশ হিসেবে দেখছেন। দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম আজ রোববার সন্ধ্যায় সুখবর ডটকমকে বলেন, “ঈদের দিনের আনন্দ তো এমন হৃদ্যতাপূর্ণই হওয়ার কথা। সেখানে আমাদের আমির কূটনীতিকদের সঙ্গে রসিকতা ও হাসিঠাট্টা করে একটু আনন্দ দিতে চেয়েছেন। তারা তো উচ্ছ্বাসিতভাবে সেটা উপভোগ করেছেন। সেটাকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়। তারপরও দৃষ্টিকটু বা বেমানান কিছু হয়ে থাকলে বিষয়টি নিয়ে আমরা আরও সতর্ক থাকবো।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা চাই মানুষ ঈদের প্রকৃত আনন্দ উপলব্ধি করুক। যে কোনো পরিস্থিতি যদি ভুলভাবে দেখানো হয়, তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতে পারে। তবে আমরা আমাদের নেতাদের আচরণের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকব।”
রাজনৈতিক ও সামাজিক দিক
বিশ্লেষকেরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, রাজনৈতিক নেতাদের আচরণকে সর্বদা রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়ে থাকে। বিশেষত বিরোধী নেতাদের ক্ষেত্রে তাদের সাধারণ সামাজিক আচরণও রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হয়ে যেতে পারে। তবে এই ধরনের আড্ডা ও আন্তরিক শুভেচ্ছা বিনিময়কে শুধু নেতিবাচক আঙ্গিক থেকে দেখা উচিত নয়।
একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, “সামাজিক ও কূটনৈতিক অনুষ্ঠানে হৃদ্যতার প্রকাশ স্বাভাবিক। একজন নেতা অতিথিদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করলে তা নেতিবাচক ব্যাখ্যা করা উচিত নয়। এটি কেবল আন্তরিকতা ও সম্পর্কের উন্নতির অংশ।”
ধর্মীয় ও সামাজিক প্রেক্ষাপট
ঈদের দিন এমন আন্তরিকতা স্বাভাবিক। বিশেষ করে ইসলামিক মূল্যবোধে ঈদ মানে হলো আনন্দ, বন্ধুত্ব ও ঐক্যের প্রকাশ। কেউ কারও সঙ্গে কোলাকুলি বা হাসিঠাট্টা করলে তা সাধারণভাবে হৃদ্যতার প্রকাশ হিসেবে গণ্য করা হয়। আইনগত বা ধর্মীয় এমন কোনো বিধিনিষেধ নেই যে এই ধরনের আচরণকে অশ্লীল বলতে হবে।
শফিকুর রহমানের আচরণকে কেন্দ্র করে সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনার বিষয়টি নিছক মনোযোগের দাবি রাখে। এটি হয়তো কিছু নেটিজেনের কাছে বিতর্কিত মনে হচ্ছে, তবে অনুষ্ঠান ও ভিডিওতে দেখা দৃশ্য অনন্যভাবে হৃদ্যতাপূর্ণ ও প্রাকৃতিক। জামায়াতের নেতারা ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টিকে দেখছেন, এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা এটিকে সাধারণ সাংস্কৃতিক আচার-ব্যবহার হিসেবে বিবেচনা করছেন।
সর্বোপরি, এটি একটি উদাহরণ যে রাজনৈতিক নেতাদের সাধারণ আচরণও কতো দ্রুত সামাজিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে। তবে বিষয়টির প্রেক্ষাপট ও সাপেক্ষতা বিবেচনায় নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
খবরটি শেয়ার করুন