ছবি: সংগৃহীত
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ড. রেহমান সোবহান মনে করেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রশ্নে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখানোর পেছনে একটি ঐতিহাসিক কারণ আছে।
১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত যেসব সরকার ক্ষমতায় ছিল, তারা রাষ্ট্রীয় পরিসর থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগের ভূমিকা প্রায় সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলেছিল। এই ইতিহাস মুছে দেওয়ার প্রবণতার প্রতিক্রিয়াতেই শেখ হাসিনার অবস্থান কঠোর হয়ে ওঠে বলে তিনি মনে করছেন।
দেশের দ্বিদলীয় রাজনীতির দুটি স্তম্ভের একটি আওয়ামী লীগ ৭৭ বছরের ইতিহাস ধারণ করা একটি রাজনৈতিক শক্তি এবং তাদের উল্লেখযোগ্য ভোটব্যাংক রয়েছে। রাজনীতি থেকে আওয়ামী শক্তি হঠাৎ করে বিলীন হয়ে যাবে—এমনটি ভাবার সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিষয়টির সুরাহা সরকারকেই করতে হবে। আর সেটি করতে ব্যর্থ হলে আমাদের ‘সংস্কারকৃত’ রাজনৈতিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে।
বিশিষ্ট সাংবাদিক ও ইংরেজি পত্রিকা ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেছেন, ১৬ বছর–১৯৭৫ সালের আগস্ট থেকে ১৯৯০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কথা বা তার হত্যাকাণ্ডের কথা আওয়ামী লীগের নিজস্ব পরিসরের বাইরে খুব কম জায়গাতেই উল্লেখ করা হতো।
তিনি বলেন, আমরা গর্ব করতে পারি, ১৯৯১ সালে ডেইলি স্টার প্রকাশের পর ১৫ই আগস্টকে বিশেষভাবে তুলে ধরতে শুরু করে। ওই বিরুদ্ধ সময়ে দুই কলামে কালো রঙের বর্ডারে বঙ্গবন্ধুর ছবি প্রকাশ করে। দেশের শীর্ষ পত্রিকাগুলোর মধ্যে ডেইলি স্টারই প্রথম এই ধারার সূচনা করে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জাতীয় দিবস বাতিলের বিষয়ে সরকারের সঙ্গে মাহফুজ আনামের মতামত প্রায় একই হলেও দ্বিমত রয়েছে তিনটি দিবস নিয়ে—৭ই মার্চ (বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের দিনটি), ১৫ই আগস্ট (বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের প্রায় সব সদস্যকে হত্যাকাণ্ডের দিন) এবং ৪ঠা নভেম্বর (গণপরিষদে যেদিন সংবিধান গৃহীত হয়)।
তিনি বলেন, এই দিনগুলোতে ইতিহাস রচিত হয়েছিল এবং কোনোভাবেই এগুলোর গুরুত্ব কমানো উচিত নয়। আমাদের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর অবদান অবিস্মরণীয়। আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের মাপকাঠিতে বঙ্গবন্ধুকে বিচার করা ঠিক হবে না। শিক্ষার্থীদের অনুরোধ করব, তারা যেন শেখ হাসিনার অপশাসনের পাল্লায় বঙ্গবন্ধুকে না মাপে।
রেহমান সোবহান ও মাহফুজ আনামের এসব বক্তব্য ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়েছে। নানা শ্রেণি-পেশার নেটিজেন তাদের বক্তব্যের পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা-সমালোচনা করছেন। তাদের বক্তব্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার লিংক অনেকে শেয়ার করছেন। বক্তব্যের জন্য রেহমান সোবহান, মাহফুজ আনাম ধন্যবাদ, প্রশংসা যেমন পাচ্ছেন একাংশের, আবার অনেক নেটিজেন আক্রমণাত্মক ভাষায় তাদের সমালোচনাও করছেন।
খোঁজ নিলে জানা যায়, দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে রেহমান সোবহান এসব কথা বলেন। তার সাক্ষাৎকারটি গত ১৬ই ডিসেম্বর 'গণতান্ত্রিক ব্যর্থতার সুযোগ নিয়েছে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি' শিরোনামে পত্রিকাটি প্রকাশ করে। রেহমান সোবহান ১৯৬০-এর দশকের স্বাধিকার আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন। তিনি ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য। ১৯৯০ সালে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্যতম উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
রেহমান সোবহান মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধসম্পন্ন রাষ্ট্র ও সমাজ নির্মাণে আমাদের ব্যর্থতা, বাংলাদেশে গণতন্ত্রের সংকট ও রাজনীতিতে গোত্রচর্চা, আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার নেতৃত্বের সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়া, চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর ডানপন্থার উত্থান, ছাত্রদের তৃতীয় রাজনৈতিক ধারা হয়ে উঠতে না পারা, মুক্তিযুদ্ধের অবিরাম লড়াই ইত্যাদি বিষয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন এ কে এম জাকারিয়া ও মনোজ দে।
আর মাহফুজ আনাম কথাগুলো বলেছেন ডেইলি স্টারে প্রকাশিত দুটি উপসম্পাদকীয়তে। দুটির মধ্যে একটি পত্রিকাটির ছাপা সংস্করণ প্রকাশিত হয় বর্তমান সরকারের আমলে, ২০২৪ সালের ১৮ই অক্টোবর। অন্য উপসম্পাদকীয়টি প্রকাশিত হয়েছিল ২০২২ সালের ২৩শে ডিসেম্বরে, আওয়ামী লীগের ২২তম ত্রি-বার্ষিক জাতীয় সম্মেলন সামনে রেখে। মাহফুজ আনামের এই দুটি কলামের লিংক সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। কলামগুলোর বক্তব্য দিয়ে ফটোকার্ডও করা হয়েছে।
২০২৪ সালের ১৮ই অক্টোবর মাহফুজ আনামের লেখাটি 'হাসিনাস মিসরুল শোড নট অ্যাফেক্ট আওয়ার জাজমেন্ট অব বঙ্গবন্ধু' শিরোনামে প্রকাশিত হয়। ২০২২ সালের ২৩শে ডিসেম্বরে তার লেখা উপসম্পাদকীয়টি 'ফ্রম বঙ্গবন্ধু টু শেখ হাসিনা' শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল।
সাক্ষাৎকারে রেহমান সোবহান বলেন, চব্বিশের আন্দোলনের মধ্যে এমন কিছু গোষ্ঠী ছিল, যারা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় বেড়ে উঠেছিল এবং চব্বিশের ৫ই আগস্টের পর তারা তাদের সেই দৃষ্টিভঙ্গি সামনে নিয়ে এসেছে। আবার একটি অংশের মধ্যে শেখ হাসিনা ও তার দলের প্রতি প্রবল বিরূপ মনোভাব বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বিরূপ মনোভাবে রূপান্তরিত হয়েছিল। এই দুই অবস্থানই ছাত্র আন্দোলনের যে রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, তার উল্টো ফল বয়ে এনেছে।
মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি, যারা আমাদের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই উপস্থিত রয়েছে, তারা ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের অভ্যুত্থানে সুযোগ নিয়েছে, এর ভেতরে ঢুকে পড়েছে এবং সম্ভবত অভ্যুত্থানের গতিমুখ নির্ধারণের ক্ষেত্রেও তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে উল্লেখ করেন ড. রেহমান সোবহান।
মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি সম্পর্কে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তারা জোরালো নির্বাচনী সম্ভাবনাসহ আরও দৃশ্যমান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তারা এই সুযোগকে ব্যবহার করে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাদের যে ঐতিহাসিক সহযোগিতার ভূমিকা, সেটাকে নতুন ভাষ্য দিতে চাইছে। রাজনৈতিকভাবে কৌশলী নেতাদের নেতৃত্বে তারা এই পর্যায়ে তাদের মুক্তিযুদ্ধ–সম্পর্কিত অবস্থান কিছুটা সতর্কতার সঙ্গে প্রকাশ করবে। ১৯৭১ সালে তাদের ভূমিকা সাফসুতরো করার ক্ষেত্রে এটা তাদের একটা রাজনৈতিক কৌশল।
নিজের উপসম্পাদকীয়তে মাহফুজ আনাম বলেন, এটাও শেখ হাসিনার একক কৃতিত্ব যে দলটি একটানা ক্ষমতায় ছিল, যার নজির বাংলাদেশে আর দ্বিতীয়টি নেই। ভারতে নির্বাসিত জীবন থেকে ১৯৮১ সালে দেশে ফেরার পর তিনি দলটির নেতৃত্বে আছেন। পঁচাত্তরের ঘাতকেরা এবং পরবর্তীতে দুই সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমান ও জেনারেল এইচ এম এরশাদ ধরেই নিয়েছিলেন যে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া আওয়ামী লীগ বাস্তবে মরে গেছে। এই দুই সরকারই আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে ন্যাক্কারজনক অপপ্রচার চালায়।
২০২২ সালের উপসম্পাদকীয়তে মাহফুজ আনাম বলেন, ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসে আওয়ামী লীগের ওপর সবচেয়ে নৃশংস আঘাত হেনে একে অস্তিত্ব সংকটের মুখে ফেলা হয়েছিল। দলের সর্বোচ্চ নেতাকে বর্বরভাবে সপরিবারে হত্যা করা হয়, যাদের মধ্যে তার ১০ বছর বয়সী সন্তানও ছিল। শেখ ও তার বোন তখন বিদেশে থাকায় বেঁচে যান।
তিনি লেখেন, ৩ মাস পর প্রথম বাংলাদেশ সরকারের (মুজিবনগর সরকার নামে পরিচিত) ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদসহ চার নেতাকে কারাগারে হত্যা করা হয়। এভাবে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হয় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বকে।
খবরটি শেয়ার করুন