ফাইল ছবি
চব্বিশের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচারের জন্য পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর পদে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে নবগঠিত সরকার। মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের নিয়োগ বাতিল করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. আমিনুল ইসলামকে নতুন চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
তবে এই পরিবর্তনের নেপথ্যে ‘রাজসাক্ষী বাণিজ্য’ ও ‘সেটলিং’ সিন্ডিকেটের মতো গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। খবর বাংলা ট্রিবিউনের।
গতকাল সোমবার (২৩শে ফেব্রুয়ারি) আইন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক গেজেটের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের কেন্দ্রীয় নেতা আমিনুল ইসলামকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। একই আদেশে ২০২৪ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর নিয়োগ পাওয়া তাজুল ইসলামের নিয়োগ বাতিল করা হয়। এদিন বিকেলেই নতুন চিফ প্রসিকিউটরের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করেন তাজুল ইসলাম।
চিফ প্রসিকিউটর পরিবর্তনের এই সময়ে প্রসিকিউশন টিমের ভেতরেই দেখা দিয়েছে চরম অস্থিরতা। প্রসিকিউশন টিমের সদস্য বিএম সুলতান মাহমুদ সরাসরি সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে ‘বাণিজ্য’ ও ‘রাজসাক্ষী নাটকের’ অভিযোগ তুলেছেন।
সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে রাজসাক্ষী বানানো নিয়ে ‘ট্রাইব্যুনালে ‘সেটলিং’ বাণিজ্য ও রাজসাক্ষী নাটক: কেন সরতে হচ্ছে তাজুল ইসলামকে’ শিরোনামে সোমবার নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি পোস্ট করেন প্রবাসে অবস্থানরত সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কাজী মোস্তাফিজুর রহমান আহাদ।
ওই পোস্টে ‘প্রসিকিউশন টিমের একটি প্রভাবশালী অংশ গোপন সমঝোতা বা ‘সেটলিং’ বাণিজ্যে লিপ্ত হয়েছে’ বলে অভিযোগ করা হয়। এদিকে তার ওই পোস্টের বক্তব্যের সঙ্গে সমর্থন জানিয়ে এবং আরও কিছু তথ্য তুলে ধরে অন্যান্য আইনজীবীদের মতোই মন্তব্য করেন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমের অন্যতম সদস্য বিএম সুলতান মাহমুদ।
প্রসিকিউটর বিএম সুলতান মাহমুদ বাংলা ট্রিবিউনের কাছে তার অভিযোগ তুলে ধরে বলেন, 'আমি দীর্ঘদিন প্রসিকিউশন টিমে কাজ করছি। সেই কাজের সুবাদেই বলছি, শুধু আইজিপি মামুন নন, আশুলিয়ার লাশ পোড়ানো মামলায় টাকার বিনিময়ে আফজালকেও রাজসাক্ষী করে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে।'
তিনি বলেন, 'তিন চার-জনের একটি সিন্ডিকেট শুরু থেকেই এই চক্রে জড়িত। ধানমন্ডি তদন্ত সংস্থায় বসে সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির সিন্ডিকেট সাবেক আইজিপি মামুনকে রাজসাক্ষীর নাটক বানায়।'
তিনি বলেন, 'সাবেক আইজিপি মামুনকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য ধানমন্ডি তদন্ত সংস্থায় আনলে সেখানে শিশির মনির উপস্থিত থাকতেন। তারা দাগি খুনি পুলিশ কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার না করে পালানোর সুযোগ করে দিয়েছেন নিরাপদে। চিফ প্রসিকিউটরের চেয়ারকে টাকা কামানোর হাতিয়ার হিসেবে তৈরি করে রেখেছে এই তাজুল সিন্ডিকেট।'
সুলতান মাহমুদ আরও বলেন, 'গত বছর নভেম্বরের শেষ দিকে আশুলিয়ার লাশ পোড়ানো মামলার আসামি আফজালের স্ত্রী সন্ধ্যার দিকে ভারী ব্যাগ নিয়ে প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিমের রুমে প্রবেশ করেন। বিষয়টি আমরা দেখার পরে সঙ্গে সঙ্গে তাজুল ইসলামের রুমে গিয়ে তাকে জানাই। এই ঘটনায় কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বরং উল্টো আমাদের বকাঝকা করেন।'
তিনি বলেন, 'তামিম তখন সবার সামনে স্বীকার করেছিলেন যে, আফজালের স্ত্রী তার রুমে এসেছিলেন। চিফ প্রসিকিউটর শুধু জিজ্ঞেস করেছিলেন আসামির স্ত্রী কেন তার রুমে গিয়েছিলেন। শুধু এই জিজ্ঞাসা করা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল। পরবর্তীতে সেই আফজালকে রাজসাক্ষী করা হলো। চূড়ান্ত বিচারে তাকে খালাস দেওয়া হলো।'
তিনি বলেন, 'চানখারপুলের মামলায় এসআই আশরাফুল গুলি করার নির্দেশনা দিচ্ছে এরকম ভিডিও প্রকাশ পাওয়ার পরও তাকে আসামি না করে সাক্ষী করা হয়েছে। সেই ভিডিও আমার কাছে আছে। রংপুরের আবু সাঈদের মামলায় এসি ইমরানকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এই ইমরানের নাম কয়েকজন সাক্ষীরা আদালতে এসে বলেছেন।'
তিনি আরও বলেন, 'আওয়ামী লীগের নেতাদের শেখ হাসিনার মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা যেতো। কিন্তু সেটা না করে মামলা প্রতি ২-৪ জনকে আসামি করে বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করে জনগণকে ধোকা দেওয়া হয়েছে। এগুলো চব্বিশের শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি।'
অভিযোগের বিষয়ে বিদায়ী চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, 'এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। কেউ ব্যক্তি চরিত্র চরিতার্থ করতে চাইলে সে বিষয়টি দুঃখজনক। এখানে স্বচ্ছভাবে বিচার হয়েছে এবং তা ট্রাইব্যুনালে প্রমাণিত হয়েছে। এগুলো উদ্দেশ্যপ্রনোদীতভাবে ছড়ানো হচ্ছে।'
এদিকে চিফ প্রসিকিউটর পরিবর্তনের ফলে প্রসিকিউশন টিমে থাকা জামায়াতপন্থী ও বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের মধ্যে বিভক্তির গুঞ্জন উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, বড় ধরনের প্রশাসনিক রদবদল বা গণ-পদত্যাগের সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম এই গুঞ্জন নাকচ করে দিয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'আমরা নতুন চিফ প্রসিকিউটরকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবো। কাজের ক্ষেত্রে কোনও অনীহার সুযোগ নেই। আজ নতুন চিফ প্রসিকিউটরের সঙ্গে আমরা বসেছি, আলাপ হয়েছে। আমরা তাকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছি।'
উল্লেখ্য, তাজুল ইসলামের আমলেই ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল। নতুন সরকার গঠনের পাঁচ দিনের মাথায় এই গুরুত্বপূর্ণ পদের পরিবর্তন বিচার ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
খবরটি শেয়ার করুন