বৃহস্পতিবার, ২৯শে জানুয়ারী ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৬ই মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** বিশ্বজুড়ে ব্যাংকিং খাতে বঞ্চনার শিকার মুসলিমরা *** সরকারি কর্মচারীদের পাঁচ বছরের বেশি থাকা ঠিক না: প্রধান উপদেষ্টা *** আড়াই মাস চেষ্টা করেও আল জাজিরা তারেক রহমানের সাক্ষাৎকার নিতে পারেনি *** মানুষের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় একসঙ্গে কাজ করতে হবে *** অজিত পাওয়ারকে বহনকারী বিমান বিধ্বস্তের আগে ‘রহস্যজনক নীরবতা’ *** ভারতীয় কূটনীতিকদের পরিবার প্রত্যাহারের সংকেত বুঝতে পারছে না সরকার *** ‘আমি কিন্তু আমলা, আপনি সুবিচার করেননি’ *** প্রধান উপদেষ্টার কাছে অ্যামনেস্টির মহাসচিবের খোলা চিঠি *** ভারত-ইউরোপের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ও বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি *** ‘গ্রিনল্যান্ড: মার্কিন হুমকি বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের বিষয়’

সাপ মারতে গিয়ে লাঠি ভেঙে ফেলেছি: ড. শাহদীন মালিক

এসএম শামীম

🕒 প্রকাশ: ০৩:২৫ অপরাহ্ন, ১১ই আগস্ট ২০২৫

#

‘সাপ মারতে গিয়ে লাঠি ভেঙে ফেলেছি’—সম্প্রতি যমুনা টেলিভিশনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এমনই মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক। তার এই মন্তব্য শুধু একটি প্রবাদ নয়, বরং এটি দেশের বিচারব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবনতির বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে বলে অনেকে মনে করছেন।

গত মঙ্গলবার (৫ই আগস্ট) টেলিভিশনটির নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত ওই সাক্ষাৎকারটি সোমবার (১১ই আগস্ট) সকাল সোয়া ১১টা পর্যন্ত দেখা হয়েছে প্রায় ৯৭ হাজার ৬৫০ বার।

শাসক সরালেও পরবর্তী করণীয় ভাবা হয়নি

সাক্ষাৎকারে ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘জুলাই-আগস্টে আমরা একটি দমনমূলক রাজনৈতিক শাসন থেকে মুক্তি পেয়েছি। যিনি ক্ষমতায় ছিলেন, তাকে সরানো গেছে। তার অনুসারীদের কেউ পালিয়েছেন, কেউ গ্রেপ্তার হয়েছেন। কিন্তু এরপর কী হবে—তা নিয়ে আন্দোলনকারীদের কারও কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা ছিল না।’

তিনি মনে করেন, এক নেতাকে সরিয়ে দিলেই রাষ্ট্র ঠিক হয়ে যাবে—এই ধারণা শিশুতোষ। বরং এরপর আরও বেশি প্রস্তুতি দরকার ছিল। সেই প্রস্তুতির অভাবেই এখন দেশ বিচারহীনতা, প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক ভঙ্গুরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

মামলার নামে অযৌক্তিক আসামি, দায়িত্বহীন পুলিশ

বর্তমান সময়ে মামলার গঠন ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ড. মালিক বলেন, ‘এখন খুনের মামলায় ১০০-২০০ জনের নাম দেওয়া হচ্ছে। এরপর ৪০০-৫০০ জন অজ্ঞাতনামা—এভাবে মামলা হতে পারে না।’

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘আমি যদি থানায় গিয়ে বলি গত রাতে আমার বাসা থেকে এরোপ্লেন চুরি হয়েছে, পুলিশ তো সেই মামলা নেবে না। পুলিশের দায়িত্ব আছে যাচাই করার—এটা আইনেই বলা আছে।’

তার মতে, এখন পুলিশের কাছে একটি মামলায় নাম উঠলে, সেটিকে যাচাই করার ন্যূনতম দায়িত্বও তারা নিচ্ছে না। উল্টো এতে তৈরি হচ্ছে জামিন বাণিজ্য, হয়রানি বাণিজ্য, এবং মামলার মাধ্যমে নির্বিচারে বিরোধী রাজনীতিকে দমন করার প্রবণতা।

‘গ্রেপ্তার’ এখন বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে

ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘আগে গ্রেপ্তার মানে হতো, কোনো অপরাধের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। এখন গ্রেপ্তার হওয়া মানে দাঁড়িয়েছে—ব্যক্তি পুলিশ বা বাদীকে ‘ম্যানেজ’ করতে পারেনি।’

তিনি বলেন, ‘একজনকে গ্রেপ্তার করলেই সেটা আইন অনুযায়ী হয়েছে—এমন মনে করার সুযোগ আর নেই। এই গ্রেপ্তার এখন রাজনৈতিক ও আর্থিক লেনদেনের হাতিয়ার।’

বিচার বিভাগে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ

তিনি উদ্বেগের সঙ্গে বলেন, ‘এখন এমন পর্যায় চলে এসেছে, যেখানে মামলার শুনানি না শোনেই আমরা অনুমান করতে পারি, রায় কী হতে যাচ্ছে।’ 

ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘বিচারকরা পক্ষপাতদুষ্ট ছিলেন—এই অভিযোগ থাকতেই পারে। কিন্তু একজন বিচারপতিকে সরাতে হলে তারও একটি প্রক্রিয়া আছে। আপনি চাইলে দুই মাসের ছুটি দিয়ে, তদন্ত করে, নিয়ম মেনে ব্যবস্থা নিতে পারেন। কিন্তু আমরা একদিনে পুরো আপিল বিভাগ শেষ করে দিয়েছি। এতে করে বিচারব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা আর থাকে না।’ তার মন্তব্য—‘সাপ মারতে গিয়ে লাঠি ভেঙে ফেলেছি’।

সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা উপেক্ষিত

মব ভায়োলেন্স নিয়ে যতটা উদ্বেগ দেখা যায়, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বেলায় ততটাই নিরবতা—এ অভিযোগ তুলে ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘আমাদের অনেকের মনেই একটা ধারণা আছে—সংখ্যালঘু নির্যাতনের খবর ভারতের তৈরি করা প্রোপাগান্ডা। কিন্তু বাস্তবে আমরা জানি, ঘটনা ঘটছে, এবং কিছু ক্ষেত্রে সরকারও তা অস্বীকার করছে।’ তিনি মনে করেন, এই অবহেলা বিপজ্জনক। ‘সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দেওয়া কেবল সামাজিক দায় নয়, এটি সংবিধানের দায়বদ্ধতা।’

ধর্মচর্চা আর ধর্মীয় রাজনীতি—এক নয়

বাংলাদেশে ধর্মচর্চার প্রতি শ্রদ্ধা থাকলেও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের প্রতি সমর্থন যে নেই, সেটি জনগণ বারবার প্রমাণ করেছে বলে মনে করেন ড. শাহদীন মালিক। তিনি বলেন, ‘ধর্মে আমাদের বিশ্বাস আছে, কিন্তু সেটি ব্যালটের রাজনীতিতে প্রতিফলিত হবে—এটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি বলেই ইসলামি দলকে ভোট দেব—এমন ভাবনা থেকে আমরা বের হয়ে এসেছি।’

রাজনৈতিক দলগুলোতে গণতন্ত্রের চর্চা নেই

ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘গণতন্ত্রের কথা বলা হয়, অথচ রাজনৈতিক দলের ভেতরেই গণতন্ত্র নেই। ৫০টি দলের নাম নিলে দেখা যাবে, যারা ৩০-৪০ বছর আগে দল চালাতেন, তারাই এখনও চালাচ্ছেন। কেউ ইচ্ছায় সরে যাননি। আর কেউ মারা গেলে তাদের ছেলে-মেয়ে দায়িত্ব নিচ্ছেন। এটা তো জমিদারি প্রথা।’ তিনি যুক্ত করেন, ‘নিজেদের মধ্যে গণতন্ত্র নেই, অথচ দেশ চালাতে এসে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবেন—এটা হতে পারে না।’

ছাত্ররাজনীতির আদর্শ নেই, আছে ক্ষমতার লোভ

ড. শাহদীন মালিক মনে করেন, গত ১৫ বছরে ছাত্ররাজনীতি, অর্থাৎ নতুন প্রজন্মের কাছে রাজনীতির মানে হয়ে দাঁড়িয়েছে—দখল, চাঁদাবাজি, প্রভাব খাটানো ও টেন্ডার বাণিজ্য। তিনি বলেন, ‘এই প্রজন্ম যে রাজনীতির মধ্যে দিয়ে বেড়ে উঠেছে, সেখানে আদর্শ বলে কিছু নেই। তারা দেখেছে, রাজনীতির মাধ্যমে শুধু সুবিধা নিতে হয়। ফলে তারা আজকে যদি রাজনীতি করে, তাতে তাদের দোষ দেওয়া যায় না—কারণ আমরা তাদের সামনে অন্য কোনো উদাহরণই রাখতে পারিনি।’

রাজনীতির সম্ভাবনা শেষ হয়নি, সুষ্ঠু নির্বাচনে ফিরবে আস্থা

সব হতাশার মধ্যেও ড. শাহদীন মালিক আশাবাদী। তিনি মনে করেন, ‘নতুন দল, নতুন নেতৃত্ব, যদি আদর্শ ও সুশাসনের প্রতিশ্রুতি দেয় এবং সেগুলোর প্রতিফলন দেখা যায়, তাহলে মানুষ সাড়া দেবে। তবে সাবধানতা দিয়ে বলেন, ‘যদি দেখা যায় নতুন দলগুলোও একইভাবে চাঁদাবাজি, দখল, সুবিধা ভাগাভাগির খেলায় নামে—তাহলে তাদের নির্বাচনে যাওয়ার কোনো অর্থ থাকবে না।’

ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘এই এক বছরে খুব জোর গলায় বলার মতো সাফল্য নেই। দুর্নীতি, মামলা বাণিজ্য, জামিন বাণিজ্য—সবই আগের চেয়ে বেড়েছে। আগে যেখানে চাঁদা এক লাখ টাকা লাগত, এখন পাঁচ লাখ টাকা লাগে।’ তবে তিনি মনে করেন, ‘আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন যদি সত্যিই সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে মানুষ এই ব্যর্থতা ভুলে যেতে পারে।’

ড. শাহদীন মালিক

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250