রাত পোহালেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের বহুল আলোচিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভুত্থানের পর এটি প্রথম সংসদ নির্বাচন, যেখানে ১২ কোটি ভোটার আজ বৃহস্পতিবার (১২ই ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারাদেশে ইতোমধ্যে প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এবারের নির্বাচনে ভোটারদের মধ্যে যেমন উৎসাহ দেখা গেছে, তেমনি রয়েছে রাজনৈতিক উত্তেজনাও।
নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত সময়ে প্রচারণা শেষ করে ভোটারদের কাছে সমর্থন চেয়েছেন প্রার্থীরা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও তাদের বিজয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।
এবারের নির্বাচনে দেশের বিভিন্ন আসনে একাধিক রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। প্রধান দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকলেও অনেক আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অংশগ্রহণ নির্বাচনী লড়াইকে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলেছে। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, মূল লড়াই হবে বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন দুই নির্বাচনী জোটের মধ্যে।
নির্বাচনকে ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে আছে। গতকাল পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম জানান, নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
আইজিপি জানান, প্রাথমিকভাবে পুলিশ আট হাজার ৭৭০টি কেন্দ্রকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এ ছাড়া দেশব্যাপী ১৬ হাজার কেন্দ্র মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ। আর প্রায় ১৬ হাজার কেন্দ্রকে সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। উচ্চ ও মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র মিলিয়ে প্রায় ২৪ হাজার কেন্দ্র বডি-ওর্ন ক্যামেরার আওতায় আনার চেষ্টা করা হবে।
তিনি জানান, প্রথম স্তরে দেশের ৪২ হাজার ৭৭৯ ভোটকেন্দ্রের প্রতিটিতে পুলিশ মোতায়েন থাকবে। দ্বিতীয় স্তরে কেন্দ্রের বাইরে ভ্রাম্যমাণ ভিত্তিতে টহল ও তদারকির জন্য পুলিশের মোবাইল টিম থাকবে। তৃতীয় স্তরে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য বিভিন্ন স্থানে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে পুলিশ মোতায়েন করা হবে।
তিনি বলেন, নির্বাচনী নিরাপত্তায় এক লাখ ৫৭ হাজার ৮০৫ পুলিশ সদস্য নিয়োজিত থাকবেন। এর মধ্যে নয় হাজার ৩৯১ জন ভোটকেন্দ্রে স্ট্যাটিক ফোর্সের দায়িত্ব পালন করবেন। বাকিরা মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ইউনিটে কাজ করবেন। এ ছাড়া নির্বাচন সংক্রান্ত সহায়তার জন্য আরও ২৯ হাজার ৭৯৮ পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবেন।
তিনি বলেন, নির্বাচন ঘিরে নিরাপত্তা বলয়ে প্রযুক্তির ব্যবহার করা হবে। নির্বাচন কমিশনের আওতাভুক্ত রিটার্নিং কর্মকর্তাদের মাধ্যমে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। সব মিলিয়ে নিরাপত্তা পরিকল্পনার আওতায় পুলিশের মোট এক লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩ সদস্যকে মোতায়েন করা হবে। নির্বাচনের নিরাপত্তা কার্যক্রমে সশস্ত্র বাহিনী, বিজিবি ও আনসারসহ অন্যান্য বাহিনীও যুক্ত রয়েছে।
বুধবার বিকেলে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে জানানো হয়, নির্বাচন ও গণভোট পর্যবেক্ষণে ইতোমধ্যে ঢাকায় পৌঁছেছেন অন্তত ৩৯৪ জন আন্তর্জাতিক নির্বাচনী পর্যবেক্ষক ও ১৯৭ জন বিদেশি সাংবাদিক। এই পর্যবেক্ষকদের মধ্যে ৮০ জন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি।
নির্বাচন উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে। মঙ্গলবার মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, গত ১লা থেকে ১০ই ফেব্রুয়ারির মধ্যে রাজনৈতিক সহিংসতার ৫৮টি ঘটনা ঘটেছে। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব ঘটনায় দুইজন নিহত ও ৪৮৯ জন আহত হয়েছেন।
এর আগে, জানুয়ারির শেষ ১০ দিনে রাজনৈতিক সহিংসতার ৪৯টি ঘটনা ঘটে, যাতে চারজন নিহত ও ৪১৪ জন আহত হন বলে সংস্থাটি জানায়। এছাড়া, জানুয়ারির ১ থেকে ১০ তারিখের মধ্যে রাজনৈতিক সহিংসতার আটটি ঘটনায় পাঁচজন নিহত ও ২৬ জন আহত হন। ১১ই থেকে ২০ই জানুয়ারির মধ্যে ১৮টি ঘটনায় দুইজন নিহত ও ১৭৬ জন আহত হন।
এবারের নির্বাচনে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন এবং নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন। এছাড়া, তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১ হাজার ২৩২ জন।
প্রবাসী, সরকারি কর্মচারী এবং ভোটগ্রহণের দায়িত্বে থাকা ও কারাগারে থাকা ব্যক্তিরা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। আজ বিকেল সাড়ে ৪টার মধ্যে যেসব পোস্টাল ব্যালট সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে পৌঁছাবে, সেগুলো গণনা করা হবে বলে জানা গেছে।
ইতোমধ্যে ১১ লাখের বেশি ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়েছেন। এছাড়া ৬ লাখ ১১ হাজার ৮১৬ জন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, ভোটকর্মী ও বন্দি পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেবেন।
নির্বাচন কমিশন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে মোট ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করছে। মোট প্রার্থীর সংখ্যা ২ হাজার ৩৪ জন। এর মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন ২৭৫ জন। দলগুলোর মধ্যে সব চেয়ে বেশি প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি, ধানের শীষ প্রতীকে লড়ছেন ২৯১ জন।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৫৮ জন প্রার্থী দিয়েছে ইসলামী আন্দোলন (হাতপাখা)। এছাড়া জামায়াতে ইসলামীর ২২৯ জন (দাঁড়িপাল্লা), জাতীয় পার্টির ১৯৮ জন (লাঙ্গল) এবং এনসিপির ৩২ জন (শাপলা কলি) প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে ৭৬ জন ‘ফুটবল’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন।
বৃহস্পতিবার ২৯৯টি সংসদীয় আসনে ভোটগ্রহণ হবে। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন স্থগিত আছে।
সবার দৃষ্টি এখন ভোটকেন্দ্র ও ভোটারদের সিদ্ধান্তের দিকে। রাত পোহালেই শুরু হবে গণতান্ত্রিক এই আয়োজন, যেখানে নির্ধারিত হবে দেশের আগামী দিনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব।
খবরটি শেয়ার করুন