ছবি: সংগৃহীত
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তার সমীকরণকে এক জটিল মোড়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এ সংঘাত কেবল ওই অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নেই, এর ঢেউ আছড়ে পড়ছে দক্ষিণ এশিয়া থেকে ইউরোপ পর্যন্ত। একদিকে যুদ্ধের দামামা, অন্যদিকে জ্বালানি সংকট ও সরবরাহ চেইন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা- সব মিলিয়ে এক অস্থির সময় পার করছে বিশ্ব।
এ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান, প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং আমাদের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রস্তুতি কতটুকু? যুদ্ধের এ দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের কৌশল কি হওয়া উচিত? এসব সমসাময়িক ও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে সুখবর ডটকমের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেছেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা।
তারা বলছেন, ইরানে হামলার কারণে আমরাসহ এ অঞ্চলের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারি সরাসরি। আর্থিক ব্যবস্থাপনা বা আর্থিক সংকট যদি শুরু হয়, তাহলে তা সারা পৃথিবীকেই আঘাত করবে। অন্যান্য দেশের মতো আমরাও এতে আঘাতপ্রাপ্ত হবো। যুদ্ধ স্থায়ী হলে বহুমাত্রিক সংকটে পড়বে বাংলাদেশ।
কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ এম হুমায়ুন কবির বলেন, এ যুদ্ধ তারেক রহমান সরকারের জন্য নতুন সমস্যা তৈরি করেছে। এ সমস্যার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে তাদের বেশকিছু পদক্ষেপ নেওয়ার দরকার হবে এবং ইতোমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্দেশনাও দিয়েছেন বাংলাদেশিরা ওখানে যারা আছেন, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। বিভিন্ন মিশনও উদ্যোগ নিচ্ছে। যদি যুদ্ধটা দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে বিভিন্ন দেশে আমাদের বাংলাদেশি ভাইবোনেরা কর্মহীন হয়ে পড়তে পারেন।
তিনি বলেন, এখন সেসব দেশে ভাইবোনেরা যারা আছেন, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনে তাদের সরিয়ে আনার জন্য আমাদের সরকারের দিক থেকে উদ্যোগ নিতে হবে। যেমনটি ১৯৯১ সালে প্রথম গালফ যুদ্ধের সময় অর্থাৎ ইরাকের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের সময় আমরা দেখেছিলাম, এরকম অবস্থার মধ্যে আমরা পড়েছিলাম। সাম্প্রতিককালে ২০১১ সালে লিবিয়ায় যখন গাদ্দাফি সরকারের পতন হয়, তখনো বাংলাদেশি ভাইবোনদের সরিয়ে আনার জন্য এমন উদ্যোগ নিতে হয়েছে।
তিনি বলেন, আমি মনে করি, সরকারের দিক থেকে এজন্য জরুরি ভিত্তিতে একটা প্রস্তুতি প্রয়োজন। দরকার হলে আমরা এ ধরনের কাজে ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশনের সহায়তা নিতে পারি, যাদের সঙ্গে আমরা আগেও কাজ করেছি। তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে একটা আপৎকালীন কন্টিনজেন্সি প্ল্যান করা দরকার, যদি তাদের সরাতে হয়। সেটা নীতিগত উদ্যোগ হোক, দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ করেই হোক, তাদের আনার জন্য যে আর্থিক সংস্থান দরকার, সেগুলো করা হোক। এ বিষয়গুলোতে আমি মনে করি, একটু উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন।
তার মতে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে গ্যাসের ক্রাইসিস হওয়ার একটা আশঙ্কাও করা হচ্ছে। সেটা যদি সত্যিই হয়, তাহলে আমাদেরও যেহেতু এলএনজি বাইরে থেকে আনতে হয়, যুদ্ধ দীর্ঘকালীন হলে এ সাপ্লাই চেইনে টান পড়বে। কাজেই সেজন্যও সরকারকে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসে এ সম্ভাব্য সাপ্লাই চেইন ডিসরাপশন হলে কী করা হবে বা সেটাকে অভ্যন্তরীণভাবে কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, তার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।
তিনি বলেন, আমাদের আশপাশে বন্ধু দেশ যারা আছে, দরকার হলে তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করে সহযোগিতা নিতে হবে। এ কাজগুলো আমাদের এখনই করতে হবে। কারণ এ যুদ্ধটা দীর্ঘায়িত হলে মানবিক সংকট ঘনীভূত হবে, আর্থিক সংকট বাড়বে। আবার অনেক ভাইবোন যারা মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়েছিল, বিমান চলাচল বন্ধ হওয়ায় তারাও যেতে পারেনি। ফলে একটা বহুমুখী সংকটের মধ্যে পড়ার একটা সমূহ আশঙ্কার দিক রয়েছে।
তিনি বলেন, আমি মনে করি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে হোক কিংবা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের নেতৃত্বেই হোক, সংশ্লিষ্ট যত মন্ত্রণালয় আছে, তাদের নিয়ে একটা টাস্কফোর্স জরুরিভাবে করা যেতে পারে, যারা প্রতিদিন এগুলো মনিটর করবে এবং কী কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, সে অনুযায়ী উদ্যোগ গ্রহণ করবে। অন্তত এ উদ্যোগটা আমার মনে হয়, আগাম প্রস্তুতি হিসেবে আমাদের ভেবে রাখা দরকার।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলছেন, বাংলাদেশের জন্য এটি একটি বড় চিন্তার বিষয়। আমাদের এখন থেকেই হোমওয়ার্ক শুরু করা উচিত। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি কথা মাথায় রেখে আমাদের পরিকল্পনা করা দরকার। যদি যুদ্ধ বড় আকার ধারণ করে, তবে আমাদের সাপ্লাই চেইন নিশ্চিতভাবেই ব্যাহত হবে। আমাদের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার ওই অঞ্চলে। যুদ্ধের দামামা বাজলে সেখানে কর্মরত আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের জানমালের নিরাপত্তা বড় সংকটে পড়বে।
তিনি বলেন, যদি অনেক মানুষ কাজ হারিয়ে একযোগে দেশে ফিরে আসতে চায়, সেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার প্রস্তুতি আমাদের আছে কিনা, তা ভাবতে হবে। একইভাবে আমাদের আমদানিকৃত পণ্যের বিকল্প উৎস খুঁজে বের করতে হবে। যেখানে ঘাটতি হতে পারে, সেগুলো অন্য কোনো দেশ থেকে আনা যায় কিনা, তার আগাম পরিকল্পনা করতে হবে। যদি আমরা আগে থেকে হোমওয়ার্ক করে রাখি, তবে বড় কোনো আঘাত এলেও আমরা তা সামলে নিতে পারব। কিন্তু পরিস্থিতি যদি নয় মাস বা তার বেশি সময় চলে, তবে ইমপ্যাক্ট মোকাবিলা করা আমাদের জন্য কঠিন হবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ ইশফাক ইলাহী চৌধুরী বলছেন, আমাদের অর্থনীতির ঝুঁকি অনেক বেশি। জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেলে বাংলাদেশ বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটে পড়বে। কাতার থেকে আমাদের এলএনজি আমদানি করা হয়; সেখানে হামলা হয়েছে। এভাবে হামলা অব্যাহত থাকলে আমদানি সংকটে পড়বে। জ্বালানিতে সামান্য সংকট তৈরি হলেও বাংলাদেশের বর্তমান যে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, সেখানে বড় ধরনের ক্ষতি হবে। রেমিট্যান্সও প্রভাবিত হতে পারে।
তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চললে অনেকের চাকরি চলে যেতে পারে। বাংলাদেশের শ্রমিকেরাও প্রভাবিত হতে পারেন। তবে পরিস্থিতি সেদিকে যাবে বলে আমি মনে করি না। তা ছাড়া আমাদের জনশক্তি বিদেশে যেসব সেক্টরে কাজ করছে, সেগুলো প্রভাবিত হওয়ার খবর এখনও আমরা দেখিনি। বিশেষ করে ইরান যে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করেই হামলা করছে। সেগুলো আবাসিক এলাকা বা শহরে পড়লে সাধারণ মানুষের হতাহত হওয়ার শঙ্কা থেকে যায়।
ইশফাক ইলাহী চৌধুরী মনে করেন, চরমপন্থার উদ্ভবের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিশেষ করে যেখানে পাকিস্তান-আফগানিস্তানে যুদ্ধ হচ্ছে। চরমপন্থাকে রাজনীতিতে কখনোই প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। বাংলাদেশসহ সবারই উচিত হবে আমরা কারও স্বার্থে ব্যবহৃত হবো না এবং আমাদের ভূমি কাউকে ব্যবহার করতে দেব না।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ যেহেতু বিশ্বব্যবস্থারই অংশ; বিশ্বের যে কোনো পরিস্থিতিতে আমাদের সর্বোত্তম কৌশলই গ্রহণ করতে হবে। আমরা যেন বড় কোনো শক্তির নিয়ন্ত্রণে চলে না যাই। আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোতে শান্তিপূর্ণ অবস্থার জন্যও কাজ করা যেতে পারে। উগ্রবাদকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। শনিবারের ঘটনার পর যেহেতু মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ আক্রান্ত, সেখানকার শ্রমিকদের খোঁজখবর নেওয়া দরকার। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে আমাদের দূতাবাসকে এ ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়ে রাখতে হবে।
খবরটি শেয়ার করুন