শুক্রবার, ১৩ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১লা ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ১৭ বছর নির্বাসনে থাকা ব্যক্তির প্রত্যাবর্তন *** বিএনপিকে অভিনন্দন জানালেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ *** এখন পর্যন্ত এককভাবে বিএনপি বিজয়ী ১৮৪ আসনে, জোটে ১৮৭ *** বাংলাদেশের নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় চীনা দূতাবাসের অভিনন্দ। *** ঐতিহাসিক বিজয়ে তারেক রহমানকে নরেন্দ্র মোদির শুভেচ্ছা *** ৩৫ বছর পর পুরুষ প্রধানমন্ত্রী পাচ্ছে বাংলাদেশ *** তারেক রহমানকে ঐতিহাসিক বিজয়ের শুভেচ্ছা, কাজ করতে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র: মার্কিন দূতাবাস *** ঢাকা-৯ আসনে জয়ী বিএনপির হাবিবুর রশিদ, স্বতন্ত্র তাসনিম জারা তৃতীয় *** ভোট দেওয়ায় স্ত্রীকে তালাক দিলেন স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা *** বিএনপি প্রার্থীকে অভিনন্দন জানালেন জামায়াতের শিশির মনির

সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তি না মেলার দায় কার?

নিজস্ব প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ১২:৫৯ পূর্বাহ্ন, ২৬শে জানুয়ারী ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

স্ত্রী ও শিশুসন্তানের মৃত্যুর পর যশোর কারাগারে থাকা বাগেরহাটের ছাত্রলীগ (নিষিদ্ধঘোষিত) সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তির জন্য বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) গোলাম মো. বাতেনের কাছে আবেদন নিয়ে গিয়েছিলেন তার স্বজনেরা। কিন্তু জেলা প্রশাসক আবেদনটি গ্রহণ না করে তাদের যশোরে যেতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু যশোর কারা কর্তৃপক্ষ লাশ জেলগেটে দেখাতে রাজি হয়।

সাদ্দামের স্ত্রী কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালি (২২) ও তার ৯ মাস বয়সী শিশুসন্তান সেজাদ হাসান নাজিফের নিথর দেহ গত শুক্রবার যশোর কারাগারের সামনে নেওয়া হয় তাকে শেষবার দেখানোর জন্য। সেখানে সাদ্দাম দেখার সময় পান পাঁচ মিনিটের কম সময়।

সে সময়ের কথা বলতে গিয়ে সাদ্দামের ভাই শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমার ভাই বাচ্চাকে কোলে নিতে পারেনি। এই আক্ষেপে গতকাল বলছে, “জীবিত অবস্থায় আমি আমার বাচ্চাকে কোলে নিতে পারলাম না, মৃত্যুর পর কোলে নিয়ে কী করব?” সে সন্তানের মাথায় হাত রেখে বলেছে, “আমি ভালো বাবা হতে পারলাম না, আমি ভালো স্বামী হতে পারলাম না। আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো।” এটা ছিল আমার ভাইয়ার শেষ কথা।’

স্ত্রী-সন্তানের মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর স্ত্রীর কাছে সাদ্দামের লেখা বলে একটি চিঠি ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। ওই চিঠিতে সন্তানকে কোলে নিতে না পারার আক্ষেপের কথা আছে। স্ত্রী-সন্তানের মৃত্যুর পরও সাদ্দামকে কারাগার থেকে প্যারোলে মুক্তি না দেওয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সর্বত্র আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

স্বজনদের মৃত্যুর পর কারাবন্দীর প্যারোলে মুক্তি সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের অধিকার। সাদ্দামের সেই অধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে নিন্দা জানিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।

আসকের চেয়ারপারসন জেড আই খান পান্না এক বিবৃতিতে বলেন, সাদ্দামকে তার মৃত স্ত্রী ও ৯ মাস বয়সী শিশুসন্তানের জানাজা ও দাফনে অংশগ্রহণের জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে যথাযথ কর্তৃপক্ষ বরাবর আনুষ্ঠানিক আবেদন জানানো হয়। তা সত্ত্বেও প্যারোলে মুক্তি না দিয়ে শুধু কারাফটকে মরদেহ দেখানোর ঘটনাকে আসক সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মনে করছে।

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭ অনুযায়ী, সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং সমান আইনি সুরক্ষার অধিকারী। অনুচ্ছেদ ৩১ নাগরিককে আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার দেয়। অনুচ্ছেদ ৩৫(৫) অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর দণ্ড বা আচরণের শিকার করা যাবে না।

‘একজন বিচারাধীন বন্দী হিসেবে জুয়েল হাসান সাদ্দাম এসব সাংবিধানিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত নন। অথচ তার স্ত্রী ও শিশুসন্তানের মৃত্যুজনিত চরম মানবিক পরিস্থিতিতে পরিবারের আবেদন থাকা সত্ত্বেও প্যারোলে মুক্তি না দেওয়া এবং জানাজা ও দাফনে অংশগ্রহণের সুযোগ অস্বীকার করা কার্যত তাকে অমানবিক ও অবমাননাকর আচরণের শিকার করেছে; যা সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদের সরাসরি ব্যত্যয়।’

সাদ্দামের মামা মো. হেমায়েত উদ্দিন বলেন, ‘আমি আবেদন করেছিলাম। জেলা প্রশাসন থেকে বলা হয়েছে, ‘‘যেহেতু যশোর জেলে, তাই আমাদের প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার সুযোগ নেই।’’ পরে বাগেরহাটের জেল সুপারের সঙ্গে দেখা করেছি। তিনি বলেছেন, ‘‘আমাদের কোনো সুযোগ নেই, আপনারা যশোরে মরদেহ নিয়ে দেখা করিয়ে আসেন।’’ পরে আমরা যশোরে দেখা করিয়েছি। সেখানেও মাত্র ৪-৫ মিনিট সময় দিয়েছে।’

হেমায়েত আরও বলেন, ‘জেলা প্রশাসন ও কারাগার থেকে যদি আমাদের বলা হতো, যশোরে আবেদন করেন, তাহলে আমরা যশোরে আবেদন করতাম। কিন্তু আমাদের কেউ জানায়নি যে যশোরে আবেদন করলে প্যারোলে মুক্তি দিতে পারে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বলেন, ‘প্যারোলের একটি আবেদন নিয়ে এসেছিল। তাদের বুঝিয়ে বলা হয়েছে। যেহেতু সে আছে যশোরের কারাগারে, আবেদন করতে হবে সেখানকার (যশোরের) জেলা প্রশাসক বা জেল সুপারের কাছে। তবে প্যারোলের ক্ষেত্রে মুক্তি পেলে শুধু ওই জেলার মধ্যে তার প্যারোলের হুকুমটা কার্যকর হবে। এখানকার প্রশাসন তাদের বিষয়ে যশোর জেলা কারাগারেও বলে দিয়েছিল। কারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও কথা বলেছিল, যেন সুন্দরভাবে, সঠিকভাবে তাদের মৃত স্বজনদের লাশ দেখতে পারে। আমরা তাদের সেখানে যাওয়া ও দেখার বিষয়ে সহযোগিতা করেছি।’

সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তির জন্য পরিবারের আবেদন গ্রহণ না করে বাগেরহাটের ডিসি ‘অপরাধ করেছেন’ বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও অপরাধ আইন বিশেষজ্ঞ আজিজুর রহমান দুলু। তার মতে, আবেদনটি নিষ্পত্তি করার দায়িত্ব ছিল বাগেরহাটের ডিসির। বিষয়টি তিনি ইমেইল বা মোবাইল ফোনে যশোরের ডিসিকে জানাতে পারতেন।

তিনি বলেন, ‘বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক বা ডিস্ট্রিক ম্যাজিস্ট্রেটের উচিত ছিল সাদ্দামের আত্মীয়ের কাছ থেকে পাওয়া আবেদনটি গ্রহণ ও নিষ্পত্তি করা। কিন্তু সেটি তিনি না করে অপরাধ করেছেন। বাগেরহাটের ডিসি সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ লঙ্ঘন করেছেন।’

এর পেছনে ব্যাখ্যা তুলে ধরে জ্যেষ্ঠ এই আইনজীবী বলেন, ‘কেননা সরকারি চাকরি আইনে বলা আছে, কোনো ব্যক্তি, সরকারি কোনো সেবা প্রাপ্তির জন্য আবেদন করিলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অথবা যে ক্ষেত্রে সময়সীমা নির্ধারিত নাই, সেই ক্ষেত্রে যুক্তিসঙ্গত সময়ের মধ্যে, প্রার্থিত সেবা সরবরাহ বা অনুরূপ আবেদন নিষ্পত্তি করিতে হইবে। যদি অনুরূপ কোনো আবেদন যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণে, প্রত্যাখ্যান বা নামঞ্জুর করা হয় অথবা নির্ধারিত বা যুক্তিসঙ্গত সময়ে সরবরাহ বা নিষ্পত্তি করা না যায়, সেই ক্ষেত্রে উহার কারণ সেবাপ্রার্থী ব্যক্তিকে অবহিত করিতে হইবে। কোনো কর্মচারী ইচ্ছাকৃতভাবে এই ধারার বিধান লঙ্ঘন করিলে, উহা অসদাচরণ হিসাবে গণ্য হইবে। এখানে দেখা যায়, বাগেরহাটের ডিসি আবেদন গ্রহণ না করে অপরাধ করেছেন।’

তিনি বলেন, ‘জুরিসডিকশন (অধিক্ষেত্র‍) নিয়ে সমস্যা দেখা দিলে একই পর্যায়ের যেকোনো কর্মকর্তার কাছে আবেদন করা হলে তিনি আবেদন গ্রহণ করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার নিকট প্রেরণ করবেন। এখানে যেহেতু সময় কম। লাশ কবরস্থ করার মতো বিষয় জড়িত। সে ক্ষেত্রে বাগেরহাটের ডিসি আবেদনটি গ্রহণ ও নিষ্পত্তি করে যশোরের ডিসিকে অবহিত করতে পারত। এই মামলার মূল বিষয় হলো, নিহতদের কবরস্থ করা হবে কোথায়। যেহেতু নিহতদের কবরস্থ করা হবে বাগেরহাটে, সেহেতু আবেদনটি বাগেরহাটের ডিসিকেই নিষ্পত্তি করা উচিত ছিল।’

জুয়েল হাসান সাদ্দাম

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250