বৃহস্পতিবার, ২৯শে জানুয়ারী ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৬ই মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

‘দেশের বিপর্যয়কালে মানুষ আশাবাদী হয়ে উঠে দুই নেত্রীর সমঝোতায়’

নিজস্ব প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ০৮:৩২ অপরাহ্ন, ১০ই ডিসেম্বর ২০২৫

#

ছবি: সংগৃহীত

আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা 'সত্বেও সম্পর্কের ক্যানভাস আরও বিশাল' বলে মনে করেন আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল। তিনি বলেন, দুই নেত্রীর মধ্যে বিরোধ, মতভেদ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেশে-বিদেশে আলোচিত বিষয় হলেও তারা একসঙ্গে মিলেমিশে একাধিকবার দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। দেশের বহু বিপর্যয়কালে মানুষ সবচেয়ে বেশি আশাবাদী হয়ে উঠে তাদের মধ্যে কোনো মতৈক্য বা সমঝোতায়।

দুই নেত্রীর নেতৃত্বেই বিভিন্ন মিছিলে যোগ দিয়েছেন উল্লেখ করেন আসিফ নজরুল বলেন, শেখ হাসিনা বন্দী হলে খালেদা জিয়া তার মুক্তির দাবি করেছিলেন। পরে খালেদা জিয়াও অন্তরীণ হলে পাশের ভবনে বন্দী শেখ হাসিনা তাকে রান্না করা খাবার পাঠিয়েছেন। পারিবারিক উৎসবে তাদের উপস্থিতির ঘটনাও আছে কিছু। দুই নেত্রীর সম্পর্কে এমন উত্থান-পতন থাকতে পারে, শেখ হাসিনার মনে বঞ্চনা ও ক্ষোভ অনেক বেশি থাকতে পারে।

শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার মধ্যে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের জন্য খালেদা জিয়াকে তুলনামূলক বেশি দায়ী করে আইন উপদেষ্টা বলেন, এটি ঠিক, তাদের মধ্যে সম্পর্কে টানাপোড়েন রয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন সময় খালেদা জিয়ার কিছু আচরণ ও সিদ্ধান্ত ছিল অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত। ১৫ই আগস্ট তার সত্যি জন্মদিন কি না, এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ক্ষমতাসীন হওয়ার পর হঠাৎ ঘটা করে ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বেদনাবিধুর দিনে তার জন্মদিন উদ্‌যাপন শুরু করা নিয়ে সমাজে ক্ষোভ রয়েছে।

উপদেষ্টা বলেন, ২১শে আগস্ট স্বয়ং শেখ হাসিনার ওপর ভয়াবহ আক্রমণের ঘটনার পর বেগম জিয়ার উক্তিও ছিল অত্যন্ত অনুচিত ও নিষ্ঠুর ধরনের। তার সরকারের আমলে সংঘটিত এই ঘটনার তদন্ত নিয়ে যে তামাশা করা হয়, সেটি ছিল প্রচণ্ড দায়িত্বহীনতার পরিচায়ক। এসব সত্যি। কিন্তু আমরা অনেকে ভুলে যাই যে এত কিছুর পরও দুই নেত্রীর মধ্যে রাজনৈতিক সদ্ভাব ও সহমর্মিতা উবে যায়নি।

'দুই নেত্রীর সম্পর্ক ও মানবিকতার প্রত্যাশা' শিরোনামে লেখা এক উপসম্পাদকীয়তে আসিফ নজরুল এসব কথা বলেন। তার লেখাটি ২০২১ সালের ২৬শে নভেম্বর দৈনিক প্রথম আলোর ছাপা সংস্করণে প্রকাশিত হয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা চলছে। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এখন অবস্থান ভারতে।

ভারতীয় গণমাধ্যমের খবর হলো, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়ার অবস্থার অবনতি হওয়ায় দিল্লিতে অবস্থান করা শেখ হাসিনা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বার্তা সংস্থা আইএএনএস লিখেছে, বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইমেইলে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে খালেদা জিয়ার দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন। রাজনৈতিক বৈরিতার মধ্যেও একনেত্রীর অসুস্থতায় আরেকজনের উদ্বেগ প্রকাশের পর দুই নেত্রীকে নিয়ে আইন উপদেষ্টার মূল্যায়ন অনেক নেটিজেনের কাছে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তারা বিষয়টি নিয়ে ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানামুখী আলোচনা করছেন।

খালেদা জিয়ার বর্তমান সংকটাপন্ন শারীরিক অবস্থা এবং তিনি যেখানে চিকিৎসা নিচ্ছেন সেই হাসপাতালে নিরাপত্তা জোরদার করার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে শেখ হাসিনা ভারতীয় গণমাধ্যমকে বলেন, খালেদা জিয়া অসুস্থ হয়েছেন শুনে আমি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। আমি প্রার্থনা করি তিনি যাতে সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন।

দেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার পরিচিতি ‘দুই নেত্রী’ হিসেবে। দেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে তারা দুজন মোট ৩০ বছরের বেশি সময় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। এক সময় তাদের বৈরী সম্পর্ক বিদেশি সংবাদমাধ্যমে ‘দুই বেগমের লড়াই’ হিসেবে চিত্রায়িত হত।

২০০৬ সালে নির্বাচন ও ক্ষমতায় যাওয়া নিয়ে আওয়ামী লীগ-বিএনপির দ্বন্দ্বে জরুরি অবস্থা জারির মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এরপর অনেক রাজনৈতিক নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয় বিভিন্ন মামলায়। তখন গ্রেপ্তার হয়েছিলেন আওয়ামী লীগ-বিএনপির দুই শীর্ষ নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াও।

২০০৭ সালের ১৬ই জুলাই ভোররাতে ঢাকার ধানমণ্ডির সুধা সদনের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় শেখ হাসিনাকে। প্রায় ৩ কোটি টাকার একটি চাঁদাবাজির মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এই গ্রেপ্তারের একদিন পরই তার মুক্তি চেয়ে গণমাধ্যমে বিবৃতি দেন খালেদা জিয়া।

খালেদা জিয়া তাতে বলেন, ‘শেখ হাসিনাকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া উচিত। শেখ হাসিনাকে মুক্ত রেখে আইন পরিচালনা করা হলে পারস্পরিক অবিশ্বাস, সন্দেহ, সামাজিক উত্তেজনা এবং রাজনৈতিক আশঙ্কা কমে আসবে।’

শেখ হাসিনাকে যেভাবে গ্রেপ্তার করে আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তাতে খালেদা জিয়া দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘শেখ হাসিনা একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় নেতার কন্যা এবং দেশের সম্মানিত নাগরিক।' তাকে গ্রেপ্তার করায় বিবেকমান নাগরিকেরা আহত হয়েছেন। এর ফলে দেশে বিদেশেও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে বলে উল্লেখ করেন খালেদা জিয়া।

শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তারের আড়াই মাস পর ২০০৭ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল অন্য আরেকটি মামলায়। খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা- দুই নেত্রীর বিরুদ্ধেই বিভিন্ন অভিযোগে একাধিক মামলা দায়ের হয় তখন। সেই সব মামলার ভেতরই একটি মামলা ছিল জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা। 

আসিফ নজরুল নিজের লেখায় বলেন, 'তাদের (শেখ হাসিনা-খালেদা জিয়া) মধ্যে সম্পর্কের ক্যানভাস আরও বিশাল। মাত্র বছর কয়েক আগেও আন্দোলন, সংগ্রাম, নির্বাচন, ক্ষমতা—সব আবর্তিত হতো এই দুই নেত্রীকে ঘিরে। তাদের মধ্যে বিরোধ, মতভেদ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল দেশে ও বিদেশে আলোচিত একটি বিষয়। কিন্তু তারা যে একসঙ্গে মিলেমিশে দুবার (এরশাদবিরোধী ও এক–এগারো সরকারবিরোধী) বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দিয়েছেন, সেটির দিকে আমাদের দৃষ্টি গেছে কম। বাংলাদেশের বহু বিপর্যয়কালে আমরা সবচেয়ে বেশি আশাবাদী হয়ে উঠতাম তাদের মধ্যে কোনো মতৈক্য বা সমঝোতায়।'

তিনি বলেন, আমরা যারা নব্বই দশকের তরুণ, দুই নেত্রীর উত্থান ঘটে আমাদের সামনেই। আমরা অনেকেই তাদের মিছিলে থেকেছি, তাদের মুক্তির দাবিতে স্লোগান দিয়েছি, এরশাদবিরোধী আন্দোলনকালে তাদের ত্যাগ, সাহসিকতা ও দৃঢ়তা দেখেছি। তাই দলমত-নির্বিশেষে কিছুটা হলেও আমাদের ভালোবাসা আর মুগ্ধতা আছে দুই নেত্রীর প্রতি। কারও ক্ষেত্রে কম, কারও ক্ষেত্রে বেশি হতে পারে, কিন্তু তাদের সম্পূর্ণ অশ্রদ্ধা বা অগ্রাহ্য করা সম্ভব নয় আমাদের পক্ষে।

তিনি জানান, এই বোধ থেকে বিভিন্ন সংকটকালে আমরা দুই নেত্রীকে সমর্থন জানাই। যেমন আমি ২১শে আগস্ট আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর সমাবেশে বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলার পর প্রতিবাদ জানিয়ে কলাম লিখেছি। এক–এগারোর সময় শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরতে বাধা দেওয়ার সময় এর বিপক্ষে লিখেছি, বলেছি। আবার বিএনপি নেত্রী প্রায় ১০ বছর ধরে যে নিরন্তর শোচনীয় ঘটনার শিকার হচ্ছেন (বাসা থেকে উচ্ছেদ, বিতর্কিত বিচার, কারাকালীন দুর্ভোগ), এর বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়েছি।

আসিফ নজরুল

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250