ছবি: সংগৃহীত
বর্তমান সরকার রাজনৈতিক বিবেচনায় রাষ্ট্রদূত নিয়োগের প্রবণতা থেকে সরে এসে কূটনৈতিক নিয়োগে নতুন বার্তা দিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে লামিয়া মোর্শেদ, ড. নিয়াজ আহমেদ খান এবং সেলিম উদ্দিনকে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগের প্রক্রিয়া স্থগিত করা হয়েছে। এই তিনজনকে রাষ্ট্রদূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে, যার নেতৃত্বে ছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তবে সরকার পরিবর্তনের পর সেই সিদ্ধান্ত আর বহাল থাকেনি।
সূত্রমতে, চলতি মাসের শুরুতে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে পাঁচটি দেশ থেকে রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই বৈঠকেই আলোচনায় আসে পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে নেওয়া রাষ্ট্রদূত নিয়োগের বেশ কিছু প্রস্তাব। সেখানেই লামিয়া মোর্শেদ, ড. নিয়াজ আহমেদ খান এবং সেলিম উদ্দিনের নিয়োগপ্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনা করে তা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ফলে আপাতত তাদের রাষ্ট্রদূত হওয়ার সম্ভাবনা বন্ধ হয়ে গেছে।
লামিয়া মোর্শেদ, যিনি দীর্ঘদিন ধরে ড. ইউনূসের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন, তাকে নেদারল্যান্ডসে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। এমনকি এ জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের কাছে ‘এগ্রিমো’ বা সম্মতিপত্রও চাওয়া হয়েছিল। তবে বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়। যদিও সে সময় সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি অস্বীকার করেছিল, তবুও প্রক্রিয়াটি চালু ছিল বলে জানা যায়।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত নেদারল্যান্ডস সরকারের কাছ থেকে এগ্রিমোর জবাব আসেনি অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদকালে। পরবর্তীতে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন করে ওই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। বর্তমানে নেদারল্যান্ডসে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন ফাইয়াজ মুর্শিদ কাজী। এতে স্পষ্ট হয়, পূর্ববর্তী সরকারের সুপারিশকৃত নামগুলো আর বিবেচনায় রাখা হয়নি।
একইভাবে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. নিয়াজ আহমেদ খানকেও রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। প্রথমে তাকে ডেনমার্কে পাঠানোর পরিকল্পনা থাকলেও সেটিও প্রকাশ্যে চলে এলে আর এগোয়নি। পরে ইরানে রাষ্ট্রদূত হিসেবে তার জন্য এগ্রিমো চাওয়া হয় এবং ইরান সরকার ইতিবাচক সাড়া দেয়। কিন্তু ব্যক্তিগত কারণে তিনি ইরানে যেতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন বলে জানা গেছে। ফলে তার নিয়োগও আর বাস্তবায়িত হয়নি।
ড. নিয়াজের রাষ্ট্রদূত হওয়ার প্রচেষ্টাকে ঘিরে নানা আলোচনা রয়েছে। জানা যায়, তিনি একাধিকবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে যোগাযোগ করেন। এমনকি বিদায়ের আগে তিনি মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এছাড়া রাজনৈতিক মহলেও যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করেন। বিশেষ করে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানেরর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন, যা নিয়োগ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হয়।
অন্যদিকে, সাবেক সচিব সেলিম উদ্দিনকে মিশরে রাষ্ট্রদূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তার ক্ষেত্রে এগ্রিমো চাওয়া হলেও এখনো মিশর সরকার থেকে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। ফলে তার নিয়োগও অনিশ্চিত অবস্থায় ছিল। বর্তমান সরকারের সিদ্ধান্তের ফলে সেটিও কার্যত বাতিলের পথে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাজনৈতিক বিবেচনায় রাষ্ট্রদূত নিয়োগের প্রবণতা কিছুটা বেড়েছিল। পেশাদার কূটনীতিকদের বাইরে থেকে নিয়োগ দেওয়ার এই প্রবণতা কূটনৈতিক মহলে বিতর্কের জন্ম দেয়। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোতে অভিজ্ঞ কূটনীতিকের বদলে রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নিয়োগের চেষ্টা সমালোচিত হয়।
বর্তমান সরকার সেই ধারা থেকে সরে এসে ভিন্ন বার্তা দিতে চাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, রাজনৈতিক বিবেচনায় রাষ্ট্রদূত নিয়োগের পরিকল্পনা এই মুহূর্তে সরকারের নেই। যদিও তিনি সরাসরি কারো নাম উল্লেখ করেননি, তবে তার বক্তব্য থেকে পরিষ্কার যে পূর্ববর্তী সরকারের নেওয়া কিছু সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে।
কূটনৈতিক অঙ্গনে এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন অনেকে। তাদের মতে, পেশাদার কূটনীতিকদের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়নে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব। অন্যদিকে রাজনৈতিক নিয়োগ অনেক সময় অভিজ্ঞতার ঘাটতির কারণে প্রত্যাশিত ফল দিতে পারে না।
সব মিলিয়ে, লামিয়া মোর্শেদ, ড. নিয়াজ আহমেদ খান এবং সেলিম উদ্দিনের রাষ্ট্রদূত হওয়ার পথ আপাতত বন্ধ হয়ে গেছে। এটি শুধু ব্যক্তিগত নিয়োগের বিষয় নয়, বরং সরকারের কূটনৈতিক নীতির পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হচ্ছে। ভবিষ্যতে রাষ্ট্রদূত নিয়োগে পেশাদারত্বকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। এমনটিই বলছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।
খবরটি শেয়ার করুন