পাহাড়ের চূড়া থেকে ঝাঁপ দেওয়ায় খোলস ফেটে মারা যায় অনেক কচ্ছপ। ছবি: সংগৃহীত
উত্তর মেসিডোনিয়ার প্রেপা হ্রদের মাঝখানে অবস্থিত এক নির্জন দ্বীপ গোলেম গ্রাদ। একসময় এই দ্বীপ কচ্ছপদের স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিত থাকলেও বর্তমানে সেখানে চলছে এক অদ্ভুত ও করুণ সংকট। গবেষকেরা জানিয়েছেন, দ্বীপের পুরুষ কচ্ছপদের মাত্রাতিরিক্ত যৌন আগ্রাসনের কারণে সেখানকার স্ত্রী কচ্ছপেরা বিলুপ্তির পথে।
এমনকি এই অত্যাচার সইতে না পেরে অনেক স্ত্রী কচ্ছপ পাহাড়ের চূড়া থেকে ঝাঁপ দিয়ে ‘আত্মহত্যা’ পর্যন্ত করছে।
মেসিডোনিয়ান ইকোলজিক্যাল সোসাইটির বাস্তুসংস্থানবিদ দ্রাগান আরসভস্কি ২০০৮ সাল থেকে এই দ্বীপের হারম্যান কচ্ছপদের নিয়ে গবেষণা করছেন। শুরুতে পাহাড়ের ওপর কচ্ছপদের দীর্ঘ সারি দেখে পর্যটক বা গবেষকদের কাছে তা কৌতুককর মনে হতো। কিন্তু বছরের পর বছর পর্যবেক্ষণের পর আরসভস্কি বুঝতে পারেন, এটি কোনো সাধারণ খেলা নয়; বরং ভয়ানক মৃত্যুফাঁদ। তথ্যসূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস।
প্রতিটি স্ত্রী কচ্ছপের বিপরীতে দ্বীপে এখন অন্তত ১৯টি প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ কচ্ছপ রয়েছে। কামোন্মত্ত পুরুষেরা যখন একটিমাত্র স্ত্রীকে তাড়া করে, তখন সেখানে রীতিমতো কচ্ছপের পাহাড় তৈরি হয়। আরসভস্কির ভাষায়, ‘স্ত্রী কচ্ছপটি আক্ষরিক অর্থেই পুরুষদের স্তূপের নিচে চাপা পড়ে যায়।’
‘ইকোলজি লেটারস’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে গবেষকেরা জানিয়েছেন, পুরুষ কচ্ছপেরা মিলনের জন্য এতটাই মরিয়া যে তারা স্ত্রী কচ্ছপকে তাড়া করার সময় ক্রমাগত কামড় দেয়, ধাক্কা দেয় এবং লেজের ধারালো অংশ দিয়ে বিদ্ধ করে। এর ফলে দ্বীপের তিন-চতুর্থাংশ স্ত্রী কচ্ছপের যৌনাঙ্গে গভীর ক্ষত এবং রক্তপাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
অবিরাম এই আক্রমণের ফলে স্ত্রী কচ্ছপেরা প্রজননক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। এক্স-রে করার পর দেখা গেছে, দ্বীপের মাত্র ১৫ শতাংশ স্ত্রী কচ্ছপ ডিম ধারণ করতে পারছে, যেখানে মূল ভূখণ্ডের কচ্ছপদের শতভাগই গর্ভবতী থাকে।
গবেষণার সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো স্ত্রী কচ্ছপদের পাহাড়ের ওপর থেকে ঝাঁপিয়ে পড়া। গবেষকেরা কৃত্রিমভাবে একটি বেষ্টনী তৈরি করে পরীক্ষা করে দেখেছেন, যখনই একদল পুরুষ কচ্ছপ কোনো স্ত্রীকে তাড়া করে, তখন নিরুপায় হয়ে ওই স্ত্রী কচ্ছপ খাড়া পাহাড়ের কিনারা থেকে নিচে ঝাঁপ দেয়।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে পাথুরে সৈকতে আছড়ে পড়ে তাদের শক্ত খোলস ফেটে যায় এবং করুণ মৃত্যু ঘটে। জিপিএস ট্র্যাকার লাগিয়ে দেখা গেছে, প্রজনন সক্ষম স্ত্রী কচ্ছপেরাই এই ঘটনার শিকার হচ্ছে বেশি।
বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই দ্বীপের কচ্ছপেরা এখন একটি ‘বিলুপ্তি ঘূর্ণাবর্তে’ আটকা পড়েছে। যদি পরিস্থিতির পরিবর্তন না হয়, তবে ২০৮৩ সালের মধ্যে এই দ্বীপের সর্বশেষ স্ত্রী কচ্ছপটিও মারা যাবে।
কেন এই দ্বীপে পুরুষদের সংখ্যা এত বেড়ে গেল, তা এখনো রহস্য। কেউ কেউ মনে করেন, কয়েক দশক আগে মানুষ হয়তো ভুলবশত অসম সংখ্যায় কচ্ছপগুলোকে এই দ্বীপে ছেড়ে গিয়েছিল। দ্বীপের অনেক বয়স্ক কচ্ছপের পিঠে রহস্যময় কিছু সংখ্যা খোদাই করা পাওয়া গেছে, যার উৎস আজও অজানা।
প্রকৃতির এক অদ্ভুত ও নিষ্ঠুর খেলায় এই রহস্যময় দ্বীপ থেকে হয়তো আগামী কয়েক দশকের মধ্যে চিরতরে হারিয়ে যাবে এই কচ্ছপ প্রজাতি, আর তাদের সঙ্গে বিলীন হয়ে যাবে তাদের দীর্ঘদিনের গোপন ইতিহাস।
খবরটি শেয়ার করুন