বৃহস্পতিবার, ২৯শে জানুয়ারী ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৫ই মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** বিশ্বজুড়ে ব্যাংকিং খাতে বঞ্চনার শিকার মুসলিমরা *** সরকারি কর্মচারীদের পাঁচ বছরের বেশি থাকা ঠিক না: প্রধান উপদেষ্টা *** আড়াই মাস চেষ্টা করেও আল জাজিরা তারেক রহমানের সাক্ষাৎকার নিতে পারেনি *** মানুষের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় একসঙ্গে কাজ করতে হবে *** অজিত পাওয়ারকে বহনকারী বিমান বিধ্বস্তের আগে ‘রহস্যজনক নীরবতা’ *** ভারতীয় কূটনীতিকদের পরিবার প্রত্যাহারের সংকেত বুঝতে পারছে না সরকার *** ‘আমি কিন্তু আমলা, আপনি সুবিচার করেননি’ *** প্রধান উপদেষ্টার কাছে অ্যামনেস্টির মহাসচিবের খোলা চিঠি *** ভারত-ইউরোপের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ও বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি *** ‘গ্রিনল্যান্ড: মার্কিন হুমকি বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের বিষয়’

‘বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীরা জিয়াকেও হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিলেন’

বিশেষ প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ১০:৫৮ অপরাহ্ন, ৩রা জানুয়ারী ২০২৬

#

ফাইল ছবি

দৈনিক প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান বলেছেন, স্বাধীনতা আন্দোলনের নায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা পরে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকেও অভ্যুত্থানের মাধ্যমে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিলেন। তাদের লক্ষ্য ছিল অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জিয়াকে হত্যা করে দেশে ‘ইসলামি সমাজতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করা। ১৯৭৫ সালের আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর ফারুক-রশিদ একাধিকবার সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে অসন্তোষ তৈরি করে অভ্যুত্থানের চেষ্টা করেছিলেন। হত্যাকারী গোষ্ঠীর সব চক্রান্ত বন্ধ হয় ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর।

তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালের ১২ই জুনের সাধারণ নির্বাচনের সময়ও বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী গোষ্ঠী সেনাবাহিনীর ভেতরে ও বাইরে ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিল। তাদের চক্রান্তের সংবাদ পেয়েই সে সময়ের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল এবং আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার নিরাপত্তাব্যবস্থাও শক্তিশালী করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী গোষ্ঠীর রশিদ ও হুদার ১৯৮০ সালের অভ্যুত্থানপ্রচেষ্টায় জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ার পরও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে ঢাকায় আসতে দেয় এরশাদের সরকার।

তিনি বলেন, শেখ মুজিবের হত্যাকারীরা জিয়াউর রহমানকে হত্যার ষড়যন্ত্রের এসব তথ্য সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানা যায় ব্রিগেডিয়ার (অব.) সাখাওয়াত হোসেনের 'বাংলাদেশ: রক্তাক্ত অধ্যায়' বই থেকে। ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেনকে (বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের নৌপরিবহন উপদেষ্টা) বিদ্রোহ-পরবর্তী সেনাসদস্যদের বিচারের জন্য সেনাবাহিনী থেকে সরকারি কৌঁসুলি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। স্বৈরাচারী এইচ এম এরশাদের শাসনামলে খুনিদের দেশে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, সত্তরের দশকের শেষে রাষ্ট্রপতি জিয়ার শাসনামলে আমরা এ তথ্য জেনেছিলাম যে, বিদেশে অবস্থানরত খুনিগোষ্ঠীর শরিফুল হক ডালিম, আজিজ পাশা, বজলুল হুদা, নূর চৌধুরীসহ এই অভিযুক্তরা ১৯৮০ সালের ১৭ই জুন ঢাকা সেনানিবাসে একটি অভ্যুত্থানের চেষ্টা করেছিলেন। সেনাবাহিনী অগ্রিম খবর পেয়ে তা ব্যর্থ করে দেয়। ঢাকায় সেনাবাহিনীতে কর্মরত কর্নেল দিদারুল আলমসহ কয়েকজন রাজনৈতিক কর্মীকে গ্রেপ্তার করে সামরিক আইনে বিচারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ঢাকার রাজনৈতিক সূত্রগুলোর মাধ্যমে তখন আমরা এসব খবর জেনেছিলাম।

মতিউর রহমান বলেন, জিয়াউর রহমানের সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়ে গেলে ডালিম, হুদা ও নূর বিদেশে নিজ নিজ কর্মস্থল ত্যাগ করে বিভিন্ন দেশে পালিয়ে যান। আজিজ পাশা তখন ঢাকায় থাকায় গ্রেপ্তার হন। তিনি রাজসাক্ষী হতে রাজি হন এবং পরে তাকে চাকরিতে পুনর্বহাল করে জিয়ার সরকার কূটনীতিকের দায়িত্ব দিয়ে রোমে পাঠায়। পরবর্তী সময়ে তাকে ঢাকায় পররাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে চাকরি দেওয়া হয়ে। এরশাদ তার সরকারের আমলে দেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে একটি সন্ত্রাসী রাজনৈতিক দল হিসেবে খুনিগোষ্ঠীর ফ্রিডম পার্টিকে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।

দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে মতিউর রহমান এসব কথা বলেন। তার লেখাটির শিরোনাম ‘খুনি চক্রকে রক্ষা করেছে জিয়া, এরশাদ ও খালেদা সরকার’। অনুসন্ধানমূলক এই নিবন্ধনটি আগে মুদ্রিত মতিউর রহমানের একটি লেখায় নতুন তথ্য সংযোজন, সংশোধন ও পরিমার্জন করে তৈরি করা হয়। যা প্রথম আলোতে প্রকাশিত হয় ২০১৯ সালের ২৮শে আগস্ট। পত্রিকাটির ওই সংখ্যা সুখবর ডটকমের সংগ্রহে আছে।

সম্প্রতি ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতিউর রহমানের ওই নিবন্ধ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নেটিজেনদের মধ্যে নানামুখি আলোচনা-পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ চলছে। ওই নিবন্ধে মতিউর রহমান বলেন, সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো, স্বৈরাচারী এরশাদের শাসনামলে খুনি রশিদ, ফারুক, শাহরিয়ার ও বজলুল হুদাকে দেশে ফিরে আসতে দেওয়া হয় এবং তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী গোষ্ঠীর শাহরিয়ার রশিদ ও বজলুল হুদার ১৯৮০ সালের ১৭ই জুন অভ্যুত্থানপ্রচেষ্টায় জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ার পরও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে ঢাকায় আসতে দেওয়া হয়। তারা ঢাকায় প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তি (প্রগশ) নামের একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। তখনই এ কথা জানা গিয়েছিল যে এরশাদ সরকার ও গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় তারা এ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। পরে বজলুল হুদা ফ্রিডম পার্টিতে যোগ দেন।

তিনি লেখেন, পরে আমরা দেখি, ১৯৮৫ সালে কর্নেল ফারুক ও কর্নেল রশিদ ‘১৫ আগস্ট বিপ্লবের আদর্শ বাস্তবায়ন’ সংগঠনের নামে ঢাকায় এসে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু করেন। ১৯৮৬ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কর্নেল ফারুক প্রার্থী হন। ১৯৮৭ সালের ৩রা আগস্ট শেরাটন হোটেলে সংবাদ সম্মেলন করে কর্নেল ফারুক রহমানকে সভাপতি করে ফ্রিডম পার্টি প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছিলেন কর্নেল রশিদ। ফ্রিডম পার্টির প্রার্থী হিসেবে বজলুল হুদাকে ১৯৮৮ সালের সংসদ নির্বাচনে মেহেরপুর-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত করা হয়। অবশ্য এর আগে ১৯৮৩ সালের ১৬ই ডিসেম্বর কর্নেল রশিদ ও কর্নেল ফারুক তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে 'মুক্তির পথ' নামে একটি বই প্রকাশ করেছিলেন।

তিনি বলেন, এটা তখনই বোঝা গিয়েছিল, স্বৈরাচারী এরশাদ গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে একটি সন্ত্রাসী রাজনৈতিক দল হিসেবে ফ্রিডম পার্টিকে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। ফ্রিডম পার্টি গঠনের পরপরই ৭ই নভেম্বর কর্নেল রশিদের নির্দেশে ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাব চত্বরে একটি সভাকে কেন্দ্র করে ফ্রিডম পার্টির ক্যাডাররা পাজেরো থেকে প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণ করলে এক কিশোরের মৃত্যু হয়েছিল। পরের বছর ১১ই ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহে একইভাবে বজলুল হুদা ও তার ক্যাডার বাহিনীর গুলিতে একজন ব্যবসায়ী মারা যান।

মতিউর রহমান বলেন, এরপর আমরা দেখি, খালেদা জিয়ার শাসনামলেও খুনিচক্রের প্রধান রশিদকে ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারির ভোটারবিহীন তথাকথিত নির্বাচনে ফ্রিডম পার্টির প্রার্থী হিসেবে কুমিল্লা-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত করা হয়। বিরোধী দলের আসনে বসার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল তাকে। সে সময় ফারুক-রশিদ ঢাকায় নানা ধরনের ব্যবসায় যুক্ত হয়েছিলেন। এবং একটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও দিয়েছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকে। অন্যদের মধ্যে ডালিম, নূর চৌধুরী, রাশেদ চৌধুরী প্রমুখ খালেদা জিয়ার শাসনামলে (১৯৯১-৯৬) কেনিয়া, হংকং ও ব্রাজিলে রাষ্ট্রদূত বা কনসাল জেনারেল পদে নিযুক্ত ছিলেন।

মতিউর রহমান বলেন, ১৯৯৬ সালের ১২ই জুনের সাধারণ নির্বাচনের সময়ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারী গোষ্ঠী বিশেষভাবে সক্রিয় ছিল বলে জানা যায়। সে সময়ে ফারুক, রশিদ, ডালিম, শাহরিয়ার প্রমুখ ঢাকায় সেনাবাহিনীর ভেতরে ও বাইরে ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিলেন। তাদের চক্রান্তের সংবাদ পেয়েই সে সময়ের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল এবং আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার নিরাপত্তাব্যবস্থাও শক্তিশালী করা হয়েছিল।

মতিউর রহমান লেখেন, খুনি চক্রের কর্মকাণ্ড থেকে দেখা যায়, রাষ্ট্রপতি জিয়া, স্বৈরাচারী এরশাদ ও বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সরকারের সময় দেশে-বিদেশে চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, সংসদ সদস্য হওয়া এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ সব কার্যক্রমের প্রকাশ্য সুযোগ-সুবিধা পেয়েছিল বঙ্গবন্ধুর খুনি চক্র। পঁচাত্তর-পরবর্তী প্রায় দুই দশক ধরে নানা ঘটনায় আরও দেখা যায়, বঙ্গবন্ধুর খুনিরা দেশে-বিদেশে যেখানেই থেকেছেন, সেখানে বসেই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছেন।

তিনি বলেন, কখনো কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যানারে, কখনোবা সামরিক বাহিনী বা সরকারের অভ্যন্তরে শক্তিগুলোর সহায়তা নিয়ে এ গোষ্ঠী ষড়যন্ত্র চালিয়ে গেছে অব্যাহতভাবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারী এই গোষ্ঠীর এসব চক্রান্ত বন্ধ হয় ১৯৯৬ সালে  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর।

মতিউর রহমান

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250