বৃহস্পতিবার, ২৯শে জানুয়ারী ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৫ই মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** বিশ্বজুড়ে ব্যাংকিং খাতে বঞ্চনার শিকার মুসলিমরা *** সরকারি কর্মচারীদের পাঁচ বছরের বেশি থাকা ঠিক না: প্রধান উপদেষ্টা *** আড়াই মাস চেষ্টা করেও আল জাজিরা তারেক রহমানের সাক্ষাৎকার নিতে পারেনি *** মানুষের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় একসঙ্গে কাজ করতে হবে *** অজিত পাওয়ারকে বহনকারী বিমান বিধ্বস্তের আগে ‘রহস্যজনক নীরবতা’ *** ভারতীয় কূটনীতিকদের পরিবার প্রত্যাহারের সংকেত বুঝতে পারছে না সরকার *** ‘আমি কিন্তু আমলা, আপনি সুবিচার করেননি’ *** প্রধান উপদেষ্টার কাছে অ্যামনেস্টির মহাসচিবের খোলা চিঠি *** ভারত-ইউরোপের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ও বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি *** ‘গ্রিনল্যান্ড: মার্কিন হুমকি বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের বিষয়’

অমানবিক এক ট্র্যাজেডি, রাষ্ট্রের নীরবতা ও গণমাধ্যমের দায়

উপ-সম্পাদকীয়

🕒 প্রকাশ: ০৫:১৬ অপরাহ্ন, ২৬শে জানুয়ারী ২০২৬

#

ছবি: ফেসবুক থেকে

শায়লা শবনম

মাত্র নয় মাসের শিশু সেজাদ হাসান। পৃথিবীকে সে চিনতে শুরু করেছিল মানুষের ভিড়, মায়ের মুখ আর অচেনা এক অপেক্ষার মধ্য দিয়ে। তার ভাগ্যে জোটেনি হতভাগ্য বাবার কোলের উষ্ণতা, বাবার বুকের পাজরের নিরাপত্তা ছাউনি। কারণ সে যখন মায়ের গর্ভে, তখন থেকেই তার বাবা কারাগারে। আর সেই শিশুটিই শেষবার বাবার সামনে হাজির হলো— তবে জীবিত নয়, মৃত অবস্থায়। মায়ের লাশের পাশে শুয়ে থাকা নিথর শরীরে।

যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের গেটে পাঁচ মিনিটের একটি দৃশ্য— বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক ট্র্যাজেডিগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। বাগেরহাট সদর উপজেলার ছাত্রলীগ নেতা জুয়েল হাসান সাদ্দাম। তার ২২ বছর বয়সী স্ত্রী কানিজ সুবর্ণা এবং ৯ মাসের শিশুসন্তান সেজাদ হাসানের মৃত্যু কেবল একটি পারিবারিক বিপর্যয় নয়— এটি রাষ্ট্র, প্রশাসন, আইন ও গণমাধ্যমের সম্মিলিত ব্যর্থতার দলিল।

 একটি পরিবারের ভেঙে পড়ার গল্প

কানিজ সুবর্ণার বয়স ছিল মাত্র ২২। এই বয়সে যেখানে একজন নারীর জীবন শুরু হওয়ার কথা, সেখানে তার জীবন কেটেছে আদালত, কারাগার আর জামিনের আশায় দৌড়ঝাঁপে। দেড় বছরের বেশি সময় ধরে স্বামী বন্দি। দিনের পর দিন তিনি অপেক্ষা করেছেন—একটি জামিনের, একটি প্যারোলের, অন্তত একটি দিনের জন্য স্বামীকে কাছে পাওয়ার। কিন্তু সেই অপেক্ষা শেষ হয়নি। শেষ হয়েছে কানিজ সুবর্ণার জীবন।

সাদ্দামের ভাই শহীদুল ইসলাম বলেছেন, ‘বাচ্চাকে জীবিত অবস্থায় কোলে নিতে পারেননি বলে কারাগারের গেইটেও আমার ভাই তাকে আর কোলে নেয়নি। শুধু মাথায় হাত বুলিয়ে সে এসব কথা বলেছে।’ তিনিসহ মোট নয়জন শনিবার যশোর কারাগারের গেইটে নিহত স্ত্রী ও সন্তানের সাথে সাদ্দামের শেষ সাক্ষাতে উপস্থিত ছিলেন।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্তান জন্মের পর অন্তত পাঁচবার কানিজ শিশুকে নিয়ে কারাগারের গেটে গিয়েছিলেন। প্রতিবারই আশা ছিল—আজ হয়তো বাবা তার সন্তানকে কোলে নিতে পারবেন। প্রতিবারই ফিরে এসেছেন ভেঙে পড়া হৃদয় নিয়ে। শহীদুল ইসলাম জানান, শিশুসন্তানকে একটিবার কোলে নিতে সাদ্দাম জেলে দায়িত্বরত পুলিশের পায়ে ধরেও অনুরোধ করেছিলেন। তারপরও মন গলেনি তাদের। শেষ পর্যন্ত, যে শিশুটিকে বাবার কোলে তুলে দিতে চেয়েছিলেন জীবিত অবস্থায়—তাকেই বাবার সামনে হাজির করা হলো মৃত অবস্থায়।

 আমি ভালো বাপ, ভালো স্বামী হতে পারিনি…

যশোর কারাগারের গেইটে সেই পাঁচ মিনিটে সাদ্দামের কণ্ঠে কোনো অভিযোগ ছিল না। ছিল না ক্ষোভ। ছিল শুধুই আত্মদহন। তিনি শিশুটিকে কোলে নেননি। মাথায় হাত বুলিয়ে শুধু বলেছিলেন— “জীবিত থাকতেই তো নিতে পারলাম না। এখন আর কী করব?” আরো বলেছিলেন—“আমি ভালো বাপ হতে পারিনি, বাপ ক্ষমা করিস।” স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলেছেন—“ভালো স্বামী হতে পারিনি, ক্ষমা করিস।”

সাদ্দামের এই কথাগুলো কোনো অপরাধীর নয়—এগুলো একজন ভেঙে পড়া পিতার, একজন পরাজিত স্বামীর স্বীকারোক্তি।

 আইনে প্যারোল কী, কাদের জন্য

বাংলাদেশে প্যারোল একটি স্বীকৃত আইনি ব্যবস্থা। মানবিক, চিকিৎসা কিংবা গুরুতর পারিবারিক কারণে বন্দিকে সাময়িক মুক্তি দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। স্ত্রী-সন্তানের মৃত্যু—এর চেয়ে বড় মানবিক কারণ আর কী হতে পারে? কিন্তু সাদ্দামের ক্ষেত্রে সেই আইন কাগজেই থেকে গেছে।

সাদ্দামের পরিবার বলছে—তারা বাগেরহাট জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেছিল। সেখান থেকে বলা হয়, যেহেতু সাদ্দাম যশোর কারাগারে, আবেদন করতে হবে যশোরে। এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ঘুরতে ঘুরতেই সময় শেষ হয়ে যায়।

অন্যদিকে যশোর জেলা প্রশাসন বলছে—কোনো লিখিত আবেদন তারা পায়নি। সাদ্দামের ভাই শহীদুল ইসলাম বলেছেন—আবেদন করা হয়েছিল, কিন্তু তা গ্রহণ করা হয়নি।

এই ‘কে দায়ী’ বিতর্কের মাঝখানে চাপা পড়ে গেছে আসল প্রশ্ন—একজন পিতা কি তার মৃত স্ত্রী ও সন্তানের জানাজায় থাকার ন্যূনতম মানবিক অধিকারও পাবে না?

 আইন বনাম মানবিকতার সংঘাত

আইন বলছে—এখতিয়ার নেই। মানবিকতা বলছে—এটা ক্ষমার অযোগ্য নিষ্ঠুরতা। যদি সত্যিই আবেদন প্রক্রিয়ায় ঘাটতি থেকেও থাকে, তাহলে প্রশ্ন আসে—রাষ্ট্র কি এমন পরিস্থিতিতে স্বপ্রণোদিত হয়ে মানবিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না? পাঁচ মিনিটের সাক্ষাৎ যদি সম্ভব হয়, তাহলে কয়েক ঘণ্টার প্যারোল কেন অসম্ভব? এখানেই রাষ্ট্রীয় নিষ্ঠুরতা সবচেয়ে নগ্ন হয়ে ওঠে।

 সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড়, প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকায় মূলধারার গণমাধ্যম

এই ঘটনায় ক্ষোভ, অসন্তোষ আর অমানবিকতার অভিযোগে সয়লাব হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। অনলাইন জগতে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। জুয়েল হাসান সাদ্দামের পরিবারের এই পরিণতি নিয়ে কবি, লেখক, মানবাধিকারকর্মী, সাধারণ মানুষ—সবাই প্রশ্ন তুলেছেন।

“মৃত শিশু দেখা করতে গেছে তার জীবিত পিতার সাথে”— কবি ইমতিয়াজ মাহমুদের এই একটি বাক্যই লাখো মানুষের বিবেক নাড়িয়ে দিয়েছে। তার এই লেখাটির পাশে একটি লাশবাহী কাভাটর্ভ্যান- এমন একটি পোস্টকার্  ভাইরাল হওয়ার পর ভাইরাল হয়। এছাড়া লেখাটি পোস্টার ও ফটোকার্ড বানিয়েও শেয়ার করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে অগণিত মানুষ। ব্যাপক ক্ষোভ, অসন্তোষের পাশাপাশি কেউ কেউ আবার সামাজিক মাধ্যমে বলেছেন- ‘আওয়ামী লীগ আমলেও এমন বা এর চেয়ে বেশি অমানবিক ঘটনা ঘটেছে’।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, দেশের মূলধারার অনেক গণমাধ্যম এই ঘটনাকে পাশ কাটিয়ে গেছে। কোথাও সংক্ষিপ্ত সংবাদ, কোথাও দায়সারা প্রতিবেদন। একটি শিশুর মৃত্যু, একটি তরুণীর আত্মহত্যা, একজন বন্দির মানবিক অধিকার— এ ধরনের ঘটনাও কী সংবাদমূল্য হারিয়েছে? নাকি রাজনৈতিক পরিচয় অনুযায়ী সহানুভূতির মানদণ্ড বদলে যায়? নতুন অপরাধের দায় ঢাকতে পুরনো কোন অমানবিক ঘটনার ইঙ্গিত টেনে সরকরণ করা যায়?

 রাষ্ট্রের দায় কোথায়?

এই ঘটনা শুধু সাদ্দামের পরিবারের নয়। এটি রাষ্ট্রের একটি আয়না। একটি রাষ্ট্র তখনই সভ্য হয়, যখন সে সবচেয়ে দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে। এখানে রাষ্ট্র দাঁড়ায়নি। দাঁড়িয়েছে কাগজের নিয়ম, দায় এড়ানোর বিবৃতি আর ক্ষমতাহীনতার অজুহাত।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে—এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ঠুরতা। আবেদন গ্রহণ না করা, এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে পাঠানো, শেষে পাঁচ মিনিটের করুণা—এসবই রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার উদাহরণ।

কানিজ সুবর্ণা ও তার শিশুসন্তানের মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি আমাদের বিচারব্যবস্থা, প্রশাসনিক কাঠামো এবং মানবিক মূল্যবোধের সম্মিলিত ব্যর্থতার ফল। যেদিন একজন পিতা তার মৃত সন্তানকে কোলে নেওয়ার অধিকার পায় না, সেদিন শুধু একটি পরিবার নয়—পুরো সমাজই হেরে যায়। আইন যদি মানবিক না হয়, তবে তা ন্যায়বিচার নয়। আর রাষ্ট্র যদি কাঁদতে না জানে, তবে সে রাষ্ট্র মানুষের নয়। সাদ্দামের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আইনের শাসন মানবিক না হলে, তার প্রতিটি ধারা একেকটি মৃত্যু ডেকে আনে।

 লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

শায়লা শবনম

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250