ছবি: ডয়চে ভেলে
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সংবিধানবিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলছেন, গণভোটের প্রশ্নগুলো জটিল; চারটি প্রশ্ন আর চারটি প্রশ্নের সঙ্গে আরও অনেক লেজুড়। সংবিধানের জটিলতম বিষয়ে গণভোট করা হচ্ছে। সংবিধানের এই জটিল ব্যাপারগুলো জেলা আদালতের একজন আইনজীবীও হয়তো বোঝেন না। এই জটিলতম সাংবিধানিক প্রশ্নে গণভোটে জনগণের মতামত চাওয়া হবে। এটা সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝার কোনো সম্ভাবনা নেই।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার গণভোটে কোনো নির্দিষ্ট পক্ষে ভোট দেওয়ার জন্য প্রচার–প্রচারণা চালাতে পারে না। এটা করে সরকার আরেকটি ভুল করছে। নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় অনেক সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারী যুক্ত থাকবেন, স্কুল–কলেজের শিক্ষকেরাও যুক্ত থাকবেন। তাদের মাধ্যমেই তো প্রচার–প্রচারণা চালানো হচ্ছে; ভোটের ব্যাপারে সরকার ইতিমধ্যে পক্ষ নিয়ে নিয়েছে। এটা ভবিষ্যতে আইনি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে পারে। হুজুগের বশবর্তী হয়ে যে মব চলছে, ভবিষ্যতে এর খেসারত আমাদের অনেক দিন দিতে হবে।
তিনি বলেন, সাধারণত দুনিয়াব্যাপী গণভোটের নিয়ম হলো একটি ব্যাপারে প্রথমে সংসদ সিদ্ধান্ত নেবে, তারা কী পরিবর্তন চায়। গণভোটের প্রচলিত এই দুই ধাপ অর্থাৎ আগে সংসদে পাস হবে, তারপর গণভোটে যাবে—এটা না করে এভাবে জটিল প্রশ্নে সরাসরি গণভোটে যাওয়াটা আইনিভাবে অবাস্তব। এই গণভোটের সিদ্ধান্ত সংসদ মানতে কতটা বাধ্য?
তিনি বলেন, সংসদের সার্বভৌমত্বের মানে হলো একটি সংসদের ওপর কেউ কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারবে না। তাহলে ১৮০ কার্যদিবস সময় দিয়ে সংসদকে গণভোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংস্কার সম্পন্ন করার যে কথা বলা হয়েছে, সেটি সাংবিধানিক ও আইনিভাবে কতটা যৌক্তিক তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তার মতে, অন্তর্বর্তী সরকার শতাধিক অধ্যাদেশ জারি করেছে, যার অনেকগুলো ভীষণ ত্রুটিপূর্ণ। পুলিশের গ্রেপ্তার–বাণিজ্য এখনো বহাল আছে এবং সরকার এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধিতে একটি ধারা সংযোজন করা হলেও, সেটি কতটা কার্যকর হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারকে সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভূমিকায় আমরা দেখতে চাই; নির্বাচনের কোনো ইস্যুতে কোনো পক্ষপাতিত্ব করবে না; সবার জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বজায় রাখবে।
শাহদীন মালিক দৈনিক প্রথম আলোকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন। তার সাক্ষাৎকারটি আজ রোববার (১৮ই জানুয়ারি) প্রথম আলোতে 'জবাবদিহি ও সুশাসনের যে অভাব ছিল, সেই অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি' শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে। শাহদীন মালিক কয়েক দশক ধরে রাজনীতি, আইন–আদালত, সংবিধান ও মানবাধিকার নিয়ে নিয়মিত লিখছেন ও বলছেন। প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন নির্বাচন, গণভোট, বিচার বিভাগ, সংস্কার ইত্যাদি বিষয়ে। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মহিউদ্দিন ফারুক ও মনজুরুল ইসলাম।
শাহদীন মালিক সাক্ষাৎকারে বলেন, নতুন সরকার (অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন) দায়িত্ব নেওয়ার তিন দিনের মাথায় আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি ছাড়া বাকি সবাইকে বিদায় করে দেওয়া হয়েছিল। এটা একটা সাংঘাতিক নেতিবাচক উদাহরণ। তর্কের খাতিরে বলছি পরের সরকার এসে যদি আবার আগের সরকারের মতোই আপিল বিভাগের সবাইকে সরিয়ে দেয়, তখন তো আমাদেরও কিছু বলার থাকবে না; অতীতে সরকার বদল হয়েছে, আপিল বিভাগে বদল হয়েছে। এটা মোটেও চিন্তাভাবনা করে করা হয়নি।
তিনি বলেন, যারা বিচারকের আসনে বসেছেন, তাদের সামনে তো এই উদাহরণটা রয়ে গেছে যে সরকার আমাদের পছন্দ না করলে আমাদের বের করে দিতে পারে; এটা মবের মাধ্যমে হোক, চাপ সৃষ্টি করে হোক; অনেক বারই তো হাইকোর্ট ঘেরাওয়ের কথা বলা হয়েছে। এই জিনিসগুলো বিচার বিভাগকে একটি বড় ধাক্কা দিয়েছে। আমরা যে একটি স্বাধীন বিচারব্যবস্থার কথা বলি, যেখানে একজন বিচারপতি অন্য কিছু চিন্তা না করে আইন ও ন্যায়বিচারের কথা চিন্তা করে বিচার করবেন, সেটির প্রতি একটি বড় আঘাত হানা হয়েছে।
প্রথম আলোর প্রশ্ন ছিল, জুলাই–আগস্টে গণ–অভ্যুত্থানের সময় হতাহতের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাগুলোতে শত শত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে, বহু মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলে করা হতো গায়েবি মামলা। এবার দেখা গেল ঢালাও মামলা বা ইচ্ছেমতো আসামি করার প্রবণতা। এসব মামলার তদন্ত এগোচ্ছে না। অনেকেই মাসের পর মাস জামিন পাচ্ছেন না। এ বিষয়ে আপনি কী বলবেন?
জবাবে শাহদীন মালিক বলেন, আইনি প্রক্রিয়ায় একজন লোকের বিরুদ্ধে মামলা নিতে হলে, গ্রেপ্তার করতে হলে পুলিশকে যৌক্তিকভাবে নিশ্চিত হতে হবে যে ওই লোকের সম্পৃক্ততা আছে। এখন একজন খুন হয়েছেন, সেখানে যদি আসামি হিসেবে ২৫০ জন লোকের নাম দেন, পুলিশের চিন্তা করা উচিত ছিল, ২৫০ জন মিলে একজনকে হত্যা করার ঘটনাটা সত্য কি না? কিন্তু পুলিশ আগের আমলে যে গ্রেপ্তার–বাণিজ্য করত, ওই গ্রেপ্তার–বাণিজ্য এখনো বহাল আছে এবং সরকার এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধিতে একটি ধারা সংযোজন করা হলেও, সেটি কতটা কার্যকর হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তিনি বলেন, সরকারের তরফ থেকে মাঝেমধ্যে বলা হয়েছে, মানুষ এসে এজাহার করলে আমরা কী করব? কেউ যখন একটি অভিযোগ নিয়ে পুলিশের কাছে যান, সেই অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা আছে কি না, সেটি যাচাই–বাছাই করার ক্ষমতা পুলিশের সব সময়ই আছে। তবে একটি মামলায় যদি দেড় থেকে দুই শ জন গ্রেপ্তার হয়, তাহলে পুলিশ যেমন গ্রেপ্তার–বাণিজ্য করতে পারে, তেমনি আমরা আইনজীবীরাও এ থেকে লাভবান হচ্ছি। এ রকম চলতে থাকলে আমরা জামিনের অনেক মামলা পাব, এটা এখন ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। এই পরিস্থিতি সরকারের রোধ করার উপায় ছিল; কিন্তু সরকার এ পথে কেন যায়নি, সেটি আমার বোধগম্য নয়।
খবরটি শেয়ার করুন