ছবি - সংগৃহীত
রবিউল হক
বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী নাট্যধারায় একটি জনপ্রিয় লোকনাট্য হিসেবে বিবেচিত বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলের ‘আলকাপ’ গান। যদিও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় এর প্রচলন বেশি দেখা যায় তবে নাটোর, নওগাঁ পর্যন্ত এর বিস্তৃতি রয়েছে। বাংলার গ্রামীণ মানুষের জীবনচিত্র খুব সুচারুভাবে ফুটিয়ে তোলা হয় লোকনাট্য ‘আলকাপ’ গানে।
আলকাপ গানের উদ্ভব ও বিকাশ
আলকাপ মূলত রঙ্গরসিকতা তথা হাস্যরসাত্মক নাট্য পরিবেশনা। তবে বৃহত্তর রাজশাহী জেলার সীমান্তবর্তী ভারতের বীরভূম ও পশ্চিমবঙ্গে এ পরিবেশনা হলো ছ্যাঁচড়া বা পাঁচমিশালী পরিবেশনা। আবার ‘আলকাপ’ শব্দটির ব্যাখ্যা নানাভাবে পাওয়া যায়। ‘আল’ মানে সীমানা (জমির আল), আর আলকাটা কাপ মানে সীমাহীন হাসি-তামাশা বা অসংযত রঙ্গ-রসিকতা। সব মিলিয়ে আলকাপকে তাই কৌতূক বা হাস্যরসাত্মক পরিবেশনা হিসেবে অভিহিত করা হয়ে থাকে। নানা ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব উপলক্ষে আলকাপ গানের পরিবেশনা হয়ে থাকে।
দলের বায়নামা
আলকাপ গানের পরিবেশনার জন্য পাঁচ হাজার থেকে দশ হাজার টাকা পর্যন্ত বায়নামা দিয়ে দল ঠিক করা হয়ে থাকে। আর সম্মানী হিসেবে বর্তমানে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা দেয়া হয়। অর্থের পরিমাণ কম-বেশি হয়ে থাকে। গ্রামের সাধারণ মানুষ আলকাপ গানের মূল পৃষ্ঠপোষক।
আলকাপ পরিবেশনের সময়
বছরের বিভিন্ন উৎসব ও লোকমেলা উপলক্ষে অন্যান্য আয়োজনের পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী লোকনাট্য আলকাপের আয়োজন করতে দেখা যায়। আলকাপ গান নির্দিষ্ট কোনো উৎসবকেন্দ্রিক নয় বরং তা সর্বজনীন পরিবেশনা রীতি হিসেবে যে কোনো সময় যে কোনো ঋতুতে পরিবেশিত হয়ে থাকে। সাধারণত সারারাত অবধি আলকাপ গানের পরিবেশনা হয়ে থাকে।
মঞ্চ বা আসর
আলকাপের মঞ্চ বা আসর খুব বেশি উঁচু হয় না। ভূমি-সমতলে গোলাকার মঞ্চে দর্শকদের অবস্থানের মাঝখানের ফাঁকা অংশে সরকার, অভিনেতা, খেমটাওয়ালি বাদ্যযন্ত্রীরা বসেন এবং এ স্থান থেকে উঠে দাঁড়িয়েই শিল্পীরা তাদের চরিত্রায়ন শেষ করে আবার দোহার দলের সাথে মিলিত হন। এছাড়া মঞ্চের উপর কাপড় বা ছামিয়ানা বা টিনের চাল দেবার রীতি বেশ প্রচলিত।
আলোর ব্যবস্থা
আলকাপ গানের পরিবেশনা বেশিরভাগ সময়ে রাতের বেলা হয়ে থাকে বলে আলোর ব্যবস্থা হিসেবে বর্তমানে বিদ্যুতের ব্যবহার বেশ জনপ্রিয়। তবে বিকল্প হিসেবে জেনারেটর বা হ্যাজাক বাতি ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
পোশাকের ব্যবহার
আলকাপ গানে পুরুষ চরিত্রের পাশাপাশি নারী চরিত্রেও পুরুষদের অভিনয় করতে দেখা যায়। এক্ষেত্রে পুরুষরা পাঞ্জাবি, ধূতি, লুঙ্গি, পরিধান করলেও নারী চরিত্রাভিনয়ের জন্য শাড়ি, ব্লাউজ, ওড়না, গামছা ব্যবহার করা হয়।
বাদ্যযন্ত্র
আলকাপ গানে বাদ্যযন্ত্র এক বিশেষ আবহ তৈরি করে। ডুগি, জুরি, মন্দিরা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে করতাল, হারমোনিয়াম, বাঁশি ও ক্যাসিও ব্যবহার করতে দেখা যায়।
পরিবেশনা রীতি
আলকাপ পরিবেশনার শুরুতেই সকল কুশিলব ও বাদ্যযন্ত্রী মঞ্চে বসে আসন গ্রহণ করে বাদ্যযন্ত্রের কনসার্ট শেষে ‘জয় জয় তানসেন কি জয়, সরস্বতীর জয়, বিশ্বনাথের জয়, সর্ব দেবতাকে জয়, বাংলাদেশের জয় বলে বন্দনা শুরু করেন। বিচিত্র এই সুরে বন্দনা গীত শেষ করে যখন সরকার দোহারদের মাঝে বসে পড়েন তখন ছোকরা তার নৃত্য নিয়ে হাজির হন। সাধারণত গীত, নৃত্য, ছন্দ বা ছড়ার তাৎক্ষণিক সৃজন প্রতিভা উপস্থাপনের সঙ্গে বর্ণনাত্মক ও সংলাপাত্মক অভিনয়ে আলকাপের পরিবেশনা রীতিতে সুস্পষ্টভাবে প্রত্যক্ষ করা যায়।
তথ্যসূত্র
১। মাযহারুল ইসলাম তরু, চাঁপাইনবাবগঞ্জের লোকসংস্কৃতির পরিচিতি, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৯৯
২। সেলিম আল দীন, মধ্যযুগের বাঙলা নাট্য, বাঙলা একাডেমী, ঢাকা, ২০১৮
৩। সাইমন জাকারিয়া, বাংলাদেশের লোকনাটকঃ বিষয় ও আঙ্গিক বৈচিত্র, বাঙলা একাডেমী, ঢাকা ২০০৮
রবিউল হক, লোক গবেষক ও শিল্পী
আই.কে.জে/