ছবি: সংগৃহীত
আওয়ামী লীগের সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গঠিত নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে 'বাংলাদেশ দ্রুত একটি ব্যর্থ জাতিরাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে' বলে মনে করছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও লেখক হাসান ফেরদৌস। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত চিন্তাবিদ অধ্যাপক রবার্ট রটবার্গের একটি জাতিরাষ্ট্রের ব্যর্থ হওয়ার লক্ষ্মণগুলো তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব বৈশিষ্ট্য বাংলাদেশে বর্তমানে বিদ্যমান।
ড. ইউনূসের সরকারের আমলে সংঘটিত দেশ-বিদেশে আলোচিত-নিন্দিত চারটি ঘটনার উল্লেখ করে হাসান ফেরদৌস বলেন, রবার্ট রটবার্গ ব্যর্থ রাষ্ট্রের যে তিন লক্ষণ সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করেছেন, এই চার উদাহরণ থেকে স্পষ্ট যে বাংলাদেশ ক্রমে তেমন একটি রাষ্ট্রের পথে হাঁটছে। সত্যি সত্যি রাষ্ট্র ব্যর্থ হলে নাগরিকদের কী দুর্দশা হয়, তা বুঝতে দয়া করে আজকের হাইতি, সোমালিয়া বা সুদানের দিকে তাকিয়ে দেখুন। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কার্যকর হতে হলে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
শরিফ ওসমান বিন হাদিকে হত্যা, তার হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় অথবা সে হত্যাকাণ্ডকে ব্যবহার করে দেশের দুটি প্রধান সংবাদপত্রের (প্রথম আলো, ডেইলি স্টার) কার্যালয়ে হামলা, একাধিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়জন ডিনকে একযোগে তাদের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের এক নেতার বাধ্য করা এবং ময়মনসিংহের ভালুকায় দীপু চন্দ্র দাস নামের এক কারখানা শ্রমিককে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা করে তার মরদেহ পুড়িয়ে দেওয়ার উল্লেখ করে তিনি বলেন, অধ্যাপক রবার্ট রটবার্গ কুড়ি বছর আগেই উত্তর দিয়ে রেখেছেন: যাদের (সরকারের) সে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ছিল, তারা হয় সে দায়িত্ব পালনে সক্ষম নয়, অথবা তা পালনে আগ্রহী নয়।
তিনি বলেন, এমন অভাবিত ঘটনার পর সরকারের পক্ষ থেকে শুকনা দুঃখ প্রকাশ ছাড়া একজনও তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কথা স্বীকার করেননি, সে জন্য ক্ষমা চাননি। পদত্যাগের তো প্রশ্নই উঠছে না। শাসক মহল যদি দায়িত্ববান হতো, তাহলে এই ব্যর্থতার দায়ভার তাদের কেউ না কেউ মাথায় পেতে দায়িত্ব থেকে সরে যেতেন।
তিনি বলেন, দায়িত্ব পালনে এই ব্যর্থতা অথবা অনাগ্রহের একটা ফল হলো, এতে সব ধরনের সহিংসতা ‘নরমালাইজড’ হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে ঠিক সে ঘটনাটাই ঘটেছে। মবতন্ত্র এখন আর অভাবিত কোনো ব্যাপার নয়, নিয়মিত ব্যাপার। আর যারা এই সহিংসতাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে চান, তারা সরকারের তরফ থেকে এই স্পষ্ট সিগন্যাল পেয়ে যান যে সহিংসতা যত তীব্র হোক না কেন, উদ্বেগের কিছু নেই।
দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক উপসম্পাদকীয়তে প্রবাসী সাংবাদিক, লেখক ও প্রাবন্ধিক হাসান ফেরদৌস এসব কথা বলেন। তার লেখাটি গতকাল রোববার (২৮শে ডিসেম্বর) পত্রিকাটির ছাপা সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে 'একটি জাতিরাষ্ট্র কখন, কেন ব্যর্থ হয়' শিরোনামে। তিনি প্রথম আলোর নিয়মিত কলাম লেখক।
হাসান ফেরদৌস বলেন, মার্কিন চিন্তাবিদ রবার্ট রটবার্গের বয়স এখন ৯০। তিনি প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও বিশ্ব শান্তি ফাউন্ডেশনের দীর্ঘদিনের সভাপতি। জীবনের বড় সময়ই তিনি কাটিয়েছেন আধুনিক জাতিরাষ্ট্র কেন ব্যর্থ হয়—এই প্রশ্নে গবেষণায়। তার সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থের নাম হোয়েন স্টেটস ফেইল; কজেস অ্যান্ড কনসিকুয়েন্সেস। অর্থাৎ যখন জাতিরাষ্ট্র ব্যর্থ হয়, তার ফলাফল কী দাঁড়ায়।
তিনি বলেন, ২০০৪ সালে প্রকাশিত সেই গ্রন্থে রটবার্গ লিখেছিলেন, জাতিরাষ্ট্র ব্যর্থ হয় তখনই, যখন সে নিজের মৌলিক দায়িত্ব পালন করতে পারে না, অথবা তা পালনে করতে অনিচ্ছুক হয়ে পড়ে। এই সব মৌলিক দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আইন ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং জনগণের জন্য প্রাথমিক রাজনৈতিক অধিকার ও সেবা প্রদান করা।
তিনি বলেন, আজকের বাংলাদেশ দ্রুত একটি ব্যর্থ জাতিরাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে, কারণ তার ওপর যে মৌলিক দায়িত্ব আরোপ করা হয়েছে, তার কোনোটাই সে পূরণে সক্ষম নয়। অথবা আরও স্পষ্ট করে বলি, সে দায়িত্ব পালনে সম্ভবত সে আদৌ ইচ্ছুক নয়। বাংলাদেশ নিয়ে এমন কঠোর ও হৃদয়বিদারক কথা আমি কখনো বলিনি, বলব সে কথাও ভাবিনি। গত কয়েক দিনের ঘটনা আমাকে এই কথা ভাবতে বাধ্য করেছে।
তিনি মনে করেন, অধিকাংশ সভ্য দেশে এ–জাতীয় সংকটের সময় একাধিক ‘প্রেশার পয়েন্ট’ কাজ করে—যেমন আদালত, আইন পরিষদ, মানবাধিকার কমিশন ও সংবাদমাধ্যম। এই মুহূর্তে বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যম ছাড়া আর অন্য কোনো প্রেশার পয়েন্ট কার্যকর নয়। তার আশু সম্ভাবনাও নেই। অতএব সংবাদমাধ্যমকে একই সঙ্গে জাতির বিবেক ও জাতির পথপ্রদর্শকের দায়িত্ব পালন করতে হবে। আমার বিশ্বাস, সে দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা তার রয়েছে।
তিনি বলেন, এক শ বছরের আগে, ১৯০৪ সালে জোসেফ পুলিৎজার মন্তব্য করেছিলেন, কোনো দেশের উত্থান ও পতন সে দেশের সংবাদপত্রের উত্থান-পতনের সঙ্গে জড়িত। সৎ, দক্ষ ও জনস্বার্থে নিবেদিত সংবাদপত্রের পক্ষেই গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে ভণ্ডামি ও প্রহসন থেকে রক্ষা করা সম্ভব। আমাদের সংবাদমাধ্যমের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ—দেশকে তারা ভণ্ডামি ও প্রহসনে নিক্ষেপ করবে, না তাকে বাঁচাতে জননৈতিকতাকে আয়নার মতো তুলে ধরবে? এর উত্তর তারাই দেবে, সে আশা করি।
সাম্প্রতিক নিন্দনীয় ঘটনার পর দায় স্বীকার করে সরকারের কেউ পদত্যাগ না করার প্রসঙ্গ তুলে ধরে হাসান ফেরদৌস বলেন, ফুটবল খেলার মাঠে উচ্ছৃঙ্খল জনতা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার জন্য মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে পশ্চিমবঙ্গের ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস পদত্যাগ করেছেন।
তিনি লেখেন, ২০০৮ সালে মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসী হামলা রোধে ব্যর্থতার জন্য ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বরাজ পাতিল পদত্যাগ করেছিলেন। ২০১৯ সালে ইস্টারের রোববার বোমা হামলা রোধে ব্যর্থতার জন্য শ্রীলঙ্কার পুলিশ প্রধান পুজিথ জায়াসুন্দ্রা পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন। ২০১৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে ভয়াবহ ফেরি দুর্ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী চুং হন-ওয়ান শুধু হাঁটু মুড়ে ক্ষমাই চাননি, পদত্যাগ করে দায়িত্ব থেকে সরেও গিয়েছিলেন।
খবরটি শেয়ার করুন