ছবি: সংগৃহীত
ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজিনা বলেছেন, ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে সরকার গঠন হবে, সেই সরকারের উচিত পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে চলমান সম্পর্ক বজায় রাখা। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন সরকার মার্কিন প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের আরও বিমান কেনা এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও ভুট্টা, সয়াবিন ও প্রযুক্তি কেনার অঙ্গীকার বজায় রাখবে।
তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র থেকে এভাবে আমদানি বাড়লে বাংলাদেশ উপকৃত হবে। এতে দেশটি রপ্তানিতে অগ্রাধিকারমূলক শুল্কসুবিধা ধরে রাখতে পারবে, এমনকি তা আরও উন্নতও হতে পারে। এই শুল্ক–সুবিধা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্রদূত হিসেবে বাংলাদেশে নিযুক্ত থাকাকালে ড্যান মজিনা এই দেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক, অর্থাৎ আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে নির্বাচন আয়োজনের পক্ষে কথা বলতেন।
এখন তার দাবি, নতুন গণতন্ত্র গড়ে তুলতে গিয়ে নতুন সরকারকে আওয়ামী লীগের রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার নিয়েও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। যেমন আওয়ামী লীগের সাবেক নেতারা জনগণের বিরুদ্ধে যে বাড়াবাড়ি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন, তার জন্য তাদের কীভাবে জবাবদিহির আওতায় আনা যাবে?
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের কোটি কোটি সমর্থক, পেছনের সারির নেতা-কর্মী ও সহানুভূতিশীল মানুষদের কীভাবে আবার রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনা যাবে? এসব প্রশ্নের মীমাংসা করা তখন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। দৈনিক প্রথম আলোতে লেখা এক নিবন্ধে সাবেক রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা এসব কথা বলেন। তার লেখাটি গতকাল রোববার (১৮ই জানুয়ারি) প্রথম আলোতে প্রকাশিত হয়েছে।
ড্যান মজিনার বক্তব্য নিয়ে কূটনৈতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের নানা জিজ্ঞাসা আছে। তারা বলছেন, দুই বৃহৎ প্রতিবেশী ভারত ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্যের বিষয়ে বাংলাদেশের যে কোনো সরকারের পররাষ্ট্র নীতি হওয়া উচিত। ড্যান মজিনার অযাচিত পরামর্শ গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি কথা বলছেন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বার্থে।
প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। গত ৩০শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত বিমানের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। এখন সব ধরনের সরকারি অনুমোদন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন হলে বোয়িংয়ের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি সই হবে। এরপর ধাপে ধাপে নতুন উড়োজাহাজ সরবরাহ শুরু করবে বোয়িং।
ড্যান মজিনা এখন অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের কথা না বললেও বাংলাদেশের আগামী সংসদ নির্বাচনকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করার আহ্বান জানাচ্ছেন ইউরোপের একাধিক দেশের এমপিরা। তারা বলেছেন, সব দলের অংশগ্রহণ না থাকলে কোনো নির্বাচনকে ‘গণতান্ত্রিক’ বলা যায় না। মুক্ত, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন না হলে বাংলাদেশের লাখ লাখ সাধারণ নাগরিক ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন এবং তারা ভোট দিতেই যাবেন না।
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গেল বছরের মে মাসে আওয়ামী লীগের সব ধরনের কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। একই মাসে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধনও স্থগিত করা হয় তাদের।
এ ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করে সম্প্রতি চার ব্রিটিশ এমপি এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, আমরা উদ্বিগ্ন যে, ব্যাপক জনসমর্থন থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর বর্তমানে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এক্ষেত্রে জাতিসংঘের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের মিত্রদের পরামর্শ উপেক্ষা করা হয়েছে। সব প্রধান রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ ছাড়া অনুষ্ঠিত কোনো নির্বাচনকে গণতান্ত্রিক বলা যায় না। ভোটারদের ওপর এমন বিধিনিষেধ আরোপ করা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বের অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত হয়নি, যারা কিনা নিজেরাই অনির্বাচিত।
বিবৃতিদাতা ব্রিটিশ হাউস অব কমন্সের এই চার এমপি হলেন—বব ব্ল্যাকম্যান, জিম শ্যানন, জ্যাস আথওয়াল এবং ক্রিস ল।
এদিকে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন সাবেক রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজিনা ঢাকায় কর্মরত থাকাকালে নয়াদিল্লির সঙ্গে বিএনপির পক্ষে দেনদরবারে খুব বেশি পক্ষপাতিত্ব করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একবার ড্যান মজিনা দেনদরবার করতে ঢাকা থেকে দিল্লিতে গেলে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা তার কাছে জানতে চান, তিনি কি ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত, নাকি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য?
সাউথব্লকের সূত্রের বরাতে ভারতীয় গণমাধ্যমে এ বিষয়ে তখন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। বাংলাদেশে তখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ।
ঢাকার সঙ্গে তখন নয়াদিল্লির কূটনৈতিক সম্পর্কও ছিল অনেকটাই একতরফা, দিল্লি তখন আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় থাকতে সমর্থন জানায়। ড্যান মজিনা বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশ ও আওয়ামী লীগের সরকারের বিরুদ্ধে নানা কর্মকাণ্ডে প্রকাশ্যেই যুক্ত ছিলেন। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে, বিশেষ করে ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে তার তৎপরতা বেড়েছে।
গত ১১ই জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার আলেকজান্দ্রিয়ার ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে ‘আসন্ন নির্বাচন-২০২৬ এবং নাগরিক সমাজের ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় অংশ নেন ড্যান মজিনা। এ আলোচনা সভার আয়োজন করে ইউএস বাংলাদেশ অ্যাডভোকেসি কাউন্সিল। এটি বিএনপিপন্থীদের সংগঠন হিসেবে পরিচিত।
সভায় বাংলাদেশে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়ের স্মৃতিচারণা করে ড্যান মজিনা বলেন, গণতন্ত্রের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে তাকে তৎকালীন সরকারের বিরাগভাজন হতে হয়েছিল, কিন্তু তিনি পিছপা হননি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ফলে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পরিবেশ তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বাংলাদেশের এই যাত্রায় পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে; কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলো গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।’
২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোটা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে সাবেক রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা বলেন, 'এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক দলের উত্থান ঘটতে পারে। আবার পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোও পুনরুজ্জীবিত হতে পারে। এটা হতেও পারে, না-ও হতে পারে।' যুক্তরাষ্ট্রের টাইম টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ড্যান মজিনা তখন এসব কথা বলেন। তার বক্তব্য পরে সত্য বলে প্রমাণিত হয়।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশের ঘটনাবলিতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ডিপ স্টেট’–এর ভূমিকা থাকার বিষয়টি ড্যান মজিনার বক্তব্যেও প্রমাণিত হয় বলে অনেকে মনে করেন।
প্রথম আলোতে প্রকাশিত নিবন্ধে ড্যান মজিনা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক জানিয়ে লেখেন, মার্কিন কূটনীতিক হিসেবে বাংলাদেশে আমার ছয় বছরের দায়িত্বকালে (এর মধ্যে তিন বছর ছিলাম রাষ্ট্রদূত হিসেবে) বেগম জিয়া বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন। ওই সময়টাতে খুব সহজেই তার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ করার বা যোগাযোগ করার সুযোগ ছিল। তিনি খুব খোলামেলা, আন্তরিক ও শ্রদ্ধাশীল আচরণ করতেন। বাংলাদেশের নানা অগ্রগতির বিষয়ে তিনি তার দৃষ্টিভঙ্গি অকপটে তুলে ধরতেন। আমি তার আন্তরিকতাকে খুবই মূল্য দিতাম। তার মৃত্যুতে আমি শোকাহত।
খবরটি শেয়ার করুন