ফাইল ছবি
আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ‘হত্যা, নির্বিচারে গ্রেপ্তারসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের’ অভিযোগে নেদারল্যান্ডসে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) মামলার আবেদন করেছে দলটি। জুলাই অভ্যুত্থানের পর নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শেখ হাসিনার সাবেক সরকারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর ‘প্রতিশোধমূলক সহিংসতার’ অভিযোগ এনে রোম সংবিধির ১৫ নম্বর বিধি অনুযায়ী এগুলোর তদন্ত শুরু করতে আইসিসির প্রসিকিউটরের কাছে অনুরোধ করা হয়েছে।
এমন সময়ে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আইসিসিতে অভিযোগ করা হলো, যখন দলটির সভাপতি ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা রায়ের অপেক্ষায় আছে। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে করা মামলার রায় ঘোষণা করা হবে আগামী সোমবার, ১৭ই নভেম্বর।
জুলাই-আগস্ট সময়ে আন্দোলন দমনে ১৪০০ জনকে হত্যার উসকানি, প্ররোচনা ও নির্দেশ দান, ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসেবলিটি’ এবং ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজের’ মোট পাঁচ অভিযোগে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড চেয়েছে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন।
আইসিসিতে আওয়ামী লীগের জমা দেওয়া আনুষ্ঠানিক আবেদনে দলীয় নেতা বা দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হত্যাকাণ্ড ও কারাবন্দী করার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের যে তদন্ত চাওয়া হয়েছে, এর তদন্ত কী হবে? এতে কী প্রতিকার মিলবে? আইসিসিতে আওয়ামী লীগের অভিযোগ কতটা যৌক্তিক? আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারে আইসিসির এখতিয়ার কতটুকু? আইসিসিতে কী ধরনের অপরাধের বিচার হয়? এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের কী অভিমত?
জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে সংঘটিত অপরাধগুলোর বিচার বিষয়ে আইসিসিতে যাওয়া না–যাওয়াকে কেন্দ্র করে আইনি বাহাস লক্ষ করা যায়। বিশেষত কে বা কারা, কখন ও কীভাবে মামলা করতে পারেন কিংবা আইসিসিই মূলত কী ধরনের অপরাধের বিচার করতে পারে, তা নিয়ে জনমনে একধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
দেশের ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে’ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে চলমান বিচারে আইনি প্রক্রিয়া লঙ্ঘনের ‘গুরুতর আশঙ্কা’ তুলে ধরে জাতিসংঘে জরুরি আবেদন জানিয়েছেন দুই ব্রিটিশ আইনজীবী। লন্ডনের ডাউটি স্ট্রিট চেম্বার্সের আইনজীবী স্টিভেন পাওলস কেসি ও তাতিয়ানা ইটওয়েল সম্প্রতি শেখ হাসিনার পক্ষে ওই আবেদন জমা দেন। জাতিসংঘের বিচারক ও আইনজীবীদের স্বাধীনতা বিষয়ক বিশেষ দূত এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বিষয়ক বিশেষ দূতের কাছে এ আবেদন জমা দিয়েছেন তারা।
ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান বহু বছর ধরে আইসিটির বিচার কার্যক্রম ও বাংলাদেশ নিয়ে লিখছেন। তিনি এ প্রসঙ্গে বলছেন, আওয়ামী লীগের করা অভিযোগগুলোকে শুধু অতীতে তার দ্বারা সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে একেবারে খারিজ করে দেওয়া যায় না। এ কথা ঠিক, ৮ই আগস্ট (২০২৪ সাল) অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর থেকে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট বা দলটির সঙ্গে যুক্ত অনেকেই গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছেন বা হওয়ার ঝুঁকিতে আছেন।
তিনি বলেন, বিশেষ করে নির্বিচার ধরপাকড় বা ইচ্ছেমতো গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছেন; কিন্তু তাই বলে এটা বলা যাবে না, আওয়ামী লীগ পুরোপুরি ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের শিকার’ (যেমনটা আইসিসিতে দাখিল করা অভিযোগে বলা হয়েছে)। ব্রিটেনের ডাউটি স্ট্রিট চেম্বারসের সবচেয়ে গুরুতর দাবি হলো, আওয়ামী লীগের ৪০০ নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে এবং তাদের অনেককেই নৃশংসভাবে পিটিয়ে বা গণপিটুনি দিয়ে মারা হয়েছে।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলাকালে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সহিংস প্রতিশোধমূলক হামলার ঘটনাগুলো সত্যিই ঘটেছিল। তবে দলটি জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনে যে ১২৬ জন নিহত মানুষের সংখ্যা দিয়েছে, তাদের সবাই এ ধরনের হামলার শিকার ছিলেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্ট এ প্রতিশোধমূলক সহিংস ঘটনার কথা স্বীকার করেছে। তবে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে, এ সহিংস ঘটনাগুলো রাষ্ট্র বা কোনো সংগঠনের নীতি অনুসারে পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছিল।
তার মতে, ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ হিসেবে কোনো সহিংসতাকে গণ্য করতে হলে তা অবশ্যই কোনো রাষ্ট্র বা সংগঠনের ইচ্ছাকৃতভাবে ও নির্দিষ্ট নীতি অনুসারে ঘটতে হবে। স্বতঃস্ফূর্ত, বিচ্ছিন্ন বা এলোমেলো ঘটনার মতো হলে তা এই শ্রেণিতে পড়বে না। জাতিসংঘের প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ওএইচসিএইচআর এমন কোনো তথ্য পায়নি, যা প্রমাণ করে এই মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো জাতীয় পর্যায়ের নেতৃত্বের নির্দেশে সংঘটিত হয়েছিল।
দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক উপসম্পাদকীয়তে এসব কথা বলেন ডেভিড বার্গম্যান। তার লেখাটি আজ বৃহস্পতিবার (১৩ই নভেম্বর) 'আইসিসিতে আওয়ামী লীগের অভিযোগ কতটা যৌক্তিক' শিরোনামে পত্রিকাটিতে প্রকাশিত হয়েছে। এতে তিনি আওয়ামী লীগের নেতা বা দলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হত্যাকাণ্ড ও কারাবন্দী করার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত চাওয়ার বিষয়টিকে আমাদের কীভাবে দেখা উচিত, সে বিষয়েও আলোচনা করেছেন।
ডাউটি স্ট্রিটের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের পক্ষে তাদের আইসিসিতে পাঠানো কমিউনিকেশন বা আনুষ্ঠানিক আবেদনে একটি ‘প্যাটার্ন’ উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত বা যুক্ত হিসেবে ধারণা করা ব্যক্তিদের অভিযোগ ছাড়াই গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং জামিন না দিয়ে বা অভিযোগ ছাড়াই কারাগারে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রাজনীতিবিদ, বিচারক, আইনজীবী, সাংবাদিকসহ কণ্ঠশিল্পী ও অভিনেতাদের মতো এমন মানুষও রয়েছেন, যাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক খুবই দূরবর্তী।
এ বিষয়ে ডেভিড বার্গম্যান লেখেন, সন্দেহাতীতভাবে আওয়ামী লীগের এ দাবিতে অনেক সত্যতা আছে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত হাজার হাজার মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন বা গ্রেপ্তারের মুখে আছেন। প্রমাণিত কোনো সত্য তথ্যের ভিত্তি ছাড়াই অনেককে হত্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে। কর্তৃপক্ষ এমন কোনো ব্যবস্থা করতে পারেনি, যা প্রকৃত অপরাধের মামলাকে রাজনৈতিক প্রতিশোধ বা সম্পর্কের কারণে করা মামলার থেকে আলাদা করতে পারে।
তিনি বলেন, এ ধরনের নির্বিচার গণগ্রেপ্তার যদি আইসিসির মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ তদন্তের জন্য যথেষ্ট বিবেচিত হয়, তবে অতীতে আওয়ামী লীগ নিজেই যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন একই অভিযোগে আইসিসিতে তদন্তের জন্য যে আবেদন করা হয়েছিল, সেটিও গ্রহণযোগ্য হতো। আওয়ামী লীগের কর্মী ও সমর্থকদের হত্যা করা এবং ইচ্ছেমতো গ্রেপ্তার করার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তবে এগুলো আইনিভাবে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের পর্যায়ে পড়ে না। আইসিসির তাই আওয়ামী লীগের আবেদন গ্রহণ করার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ মনে করেন, আওয়ামী লীগ যুক্তরাজ্যের সুপরিচিত আইনি সেবাদানকারী সংস্থা ডাউটি স্ট্রিট চেম্বারসের দুই জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর মাধ্যমে আইসিসিতে যে ‘কমিউনিকেশন’ বা আনুষ্ঠানিক আবেদন জমা দিয়েছে, এর মাধ্যমে দলটি মূলত তাদের প্রতি নির্যাতনের বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরে রাজনৈতিক জনমত সৃষ্টি করতে চাচ্ছে। যা দলটির রাজনৈতিক কৌশল। ডেভিড বার্গম্যানও বলছেন, এ দৃষ্টিকোণ থেকে আইসিসিতে করা অভিযোগকে আওয়ামী লীগের একটি বড় ধরনের প্রচারাভিযানের অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল মনে করেন, বিশ্বের দরবারে দেশের মর্যাদা ক্ষুন্ন করতে আওয়ামী লীগ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ ৬২ জনের বিরুদ্ধে আইসিসিতে পিটিশন দিয়েছে। এটা কোনো মামলা না, এটা আইসিসির প্রসিকিউশন অফিসকে একটা পিটিশন লিখে জানানো। এটা পৃথিবীর যে কোনো মানুষ করতে পারেন। এটা এতই অবিশ্বাস্য ও বস্তুনিষ্টহীনতামূলক, কোনোভাবেই এটা গৃহীত হওয়ার কারণ নেই।
প্রসঙ্গত, আইসিসিতে কখনো কোনো ব্যক্তি মামলা করতে পারেন না। রাষ্ট্র, নিরাপত্তা পরিষদ বা প্রসিকিউটর মূলত আন্তর্জাতিক অপরাধ সংঘটনের কোনো একটা ঘটনাকে আইসিসির নজরে নিয়ে এসে বিচারের ব্যবস্থা করে থাকে। এর ২০০৯ সালের রেগুলেশনস অব দ্য অফিস অব দ্য প্রসিকিউটরের ২৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ অথবা বেসরকারি সংস্থা সংঘটিত অপরাধের বিষয়ে প্রসিকিউটর অফিসে তথ্য-উপাত্ত বা প্রমাণ সম্পর্কিত কাগজপত্র জমা দিতে পারে।
কিন্তু সেগুলো জমা দেওয়া মানেই আইসিসিতে কোনো মামলা হওয়া নয়। আদৌ তা প্রাথমিক অনুসন্ধান ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষে একটা বিচারযোগ্য মামলা হিসেবে চূড়ান্তভাবে আইসিসির ট্রায়াল কোর্টে যাবে কি যাবে না, তা নির্ভর করে জুরিসডিকশন ও অ্যাডমিসিবিলিটি প্রশ্নগুলো সুরাহা করার ওপর।
আইসিসিতে সাধারণত চার ধরনের অপরাধের বিচার করা যায়—জেনোসাইড, মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও আগ্রাসনের অপরাধ। ১৯৯৮ সালের মূল আইনে প্রথম তিনটি অপরাধের কথা বলা ছিল। ২০১০ সালে রোম সংবিধিতে সংশোধনীর মাধ্যমে ক্রাইম অব অ্যাগ্রেশন বা আগ্রাসনের অপরাধের বিচারের ব্যবস্থা করা হয়।
খবরটি শেয়ার করুন