ছবি: সংগৃহীত
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির সদ্য প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ঢাকা সেনানিবাসের মইনুল রোডের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করার জন্য ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা এবং সাবেক কয়েক সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক জ ই মামুন ও সৈয়দ বোরহান কবীরকেও দায়ী করেছে দৈনিক আমার দেশ। পত্রিকাটির একটি বিশেষ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আমার দেশ-এর অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই দুই সাংবাদিকও খালেদা জিয়াকে ওই বাড়ি থেকে উচ্ছেদের কুশীলব!
আমার দেশের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খালেদা জিয়ার মইনুল রোডের ওই বাড়ি থেকে মদ উদ্ধার নাটক মঞ্চস্থকারী সাংবাদিক জ ই মামুন এবং গণমাধ্যমে কলাম লিখে প্রোপাগান্ডা তৈরিকারী সাংবাদিক সৈয়দ বোরহান কবীর তাকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের কুশীলব। এছাড়া 'কুশীলব' হিসেবে জ ই মামুন ও বোরহান কবীরের ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অন্য কোনো তথ্য-প্রমাণ প্রতিবেদনে নেই। আমার দেশের প্রতিবেদনটির লিংক ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। নানা শ্রেণি-পেশার নেটিজেনের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে নানামুখী আলোচনা চলছে।
ঢাকা সেনানিবাসের মইনুল রোডের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি থেকে ২০১০ সালের ১৩ই নভেম্বর সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে উচ্ছেদ করা হয়। আমার দেশ বলছে, 'স্বামীর সঙ্গে ব্যক্তিগত স্মৃতি, ইতিহাস, সামষ্টিক নিরাপত্তা, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত মর্যাদার সঙ্গে জড়িত ওই বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হওয়া ছিল খালেদা জিয়ার জন্য অত্যন্ত বেদনাপূর্ণ আঘাত।' নেটিজেনদের মতে, সাংবাদিকদের কোনো ধরনের নির্বাহী ক্ষমতা থাকে না। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সরকারের ওই সিদ্ধান্তে সাংবাদিকেরা কুশীলব হওয়ার সুযোগ কতটুকু?
তাদের মতে, রাজনৈতিক বিশ্লেষক জ ই মামুন ও বোরহান কবীর তখন কী লিখেছিলেন, বা প্রতিবেদনে কী বলেছিলেন, সাংবাদিকতার নীতিমালার সঙ্গে তা কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, এই নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা হতে পারে। প্রতিবেদন প্রকাশ করায় ও কলাম লেখায় তাদের কুশীলব বলার যৌক্তিকতা কতটুকু? একই বিষয়ে প্রতিবেদন তখনকার অনেক সংবাদমাধ্যম যাচাই-বাছাই ছাড়াই প্রকাশ করেছে।
গত বুধবার (১৪ই জানুয়ারি) বিকেলে সিরডাপ মিলনায়তনে ‘গণমাধ্যম সংস্কার: বর্তমান অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক সংলাপে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ বলেন, 'সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সাংবাদিকদের হত্যাযোগ্য করে তোলা হচ্ছে।' নেটিজেনদের অভিযোগ, মূলধারার কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমও তাদের প্রতিবেদনে বর্তমান সরকার বিরোধী সাংবাদিকদের হত্যাযোগ্য করে তুলছে।
অনেকে বলছেন, কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমের এই ধরনের আচরণের প্রধান কারণ দেশের গণমাধ্যমগুলোর পলিটিক্যাল প্যারালেলিজম অর্থাৎ তাদের অধিকাংশই কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কমবেশি সম্পৃক্ত। দ্বিতীয়ত, মিডিয়া হাউসগুলোর অর্থনৈতিক কাঠামো ও প্রয়োজনীয়তাও একটি বড় কারণ।
তাদের মতে, মূলত এ দুই কারণে সংবাদমাধ্যমগুলো তাদের সংবাদ উপস্থাপনে প্রায়ই একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষের অনুকূলে ঝুঁকে পড়ে। ফলে অনেক সময় তারা সাংবাদিকতার বস্তুনিষ্ঠতার নীতি লঙ্ঘন করে এবং ‘জার্নালিস্টিক পাওয়ার’-এর অপব্যবহার করে। যা অতীতে ঘটছে এবং এখনো ঘটছে।
'খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের কুশীলবেরা' শিরোনামে আমার দেশের আলোচ্য বিশেষ প্রতিবেদনটি আজ শুক্রবার (১৬ই জানুয়ারি) পত্রিকাটির ছাপা সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে।
এতে বলা হয়, 'খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের সঙ্গে জড়িত ছিলেন- ভারতে পালিয়ে যাওয়া স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা, তার সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ও এস কে সিনহা, আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি মোজাম্মেল হক, সাবেক সেনাপ্রধান মোহাম্মদ আবদুল মুবীন, ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) মোল্লা ফজলে আকবর, এডিজি মেজর জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ, অভিযানে অন্যতম নেতৃত্বদানকারী আমেরিকা-প্রবাসী লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মোস্তাফিজুর রহমান, বিটিআরসির সাবেক চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) জিয়া আহমেদ, মদ উদ্ধার নাটক মঞ্চস্থকারী সাংবাদিক জ ই মামুন এবং গণমাধ্যমে কলাম লিখে প্রোপাগান্ডা তৈরিকারী সাংবাদিক সৈয়দ বোরহান কবীর।'
জ ই মামুন সম্পর্কে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, 'সেনানিবাসের বাড়ি থেকে খালেদা জিয়াকে উচ্ছেদের পর মিডিয়ায় মদ উদ্ধার নাটকের মিথ্যা প্রতিবেদন করে প্রোপাগান্ডা তৈরি করেছিলেন সাংবাদিক জ ই মামুন। শুধু মদ উদ্ধার নয়; বাড়ি থেকে খালেদাকে কেন বের করা হলো, তা নিয়ে সাজানো প্রতিবেদন তৈরি করেছিলেন তিনি।' সেই প্রতিবেদনটি কী বিষয়ে ছিল, তা উল্লেখ করা হয়নি।
সৈয়দ বোরহান কবীর সম্পর্কে বলা হয়, খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের পক্ষে পত্রিকায় কলাম লিখে প্রোপাগান্ডা তৈরি করতেন সাংবাদিক সৈয়দ বোরহান কবীর। শেখ হাসিনার সাবেক প্রেস সচিব পলাতক সম্পাদক নাইমুল ইসলাম খানের আমাদের সময় পত্রিকায় সৈয়দ বোরহান কবীরের একটি লেখা প্রকাশ করা হয়।
বোরহান কবীর সেখানে লেখেন, ‘জিয়াউর রহমান পরিবার যে বিপুল রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য ও সহায়তা পেয়েছে, বাংলাদেশে অন্য কোনো রাষ্ট্রপতি, রাজনীতিবিদ বা সেনা কর্মকর্তা মৃত্যুর পর এর কানাকড়িও পাননি। সময় প্রবাহে বেগম জিয়া গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে এসেছেন। তিনবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। তার সেই অনিশ্চিত অর্থনৈতিক অবস্থা এখন আর নেই। তার সন্তানরাও সফল ব্যবসায়ী। জেনারেল জিয়াউর রহমানের সমসাময়িক কর্মকর্তাদের তুলনায় শিক্ষায় না হোক, বিত্তের দিক থেকে তার সন্তানরা অনেক এগিয়ে। তারা এখন বিত্তবান।’
তিনি আরো লেখেন, ‘তাদের এ বিত্তের প্রসার ঘটুক, আমাদের আপত্তি নেই। বেগম জিয়া আজ সচ্ছল ও স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করছেন। আমার বিশ্বাস, আজ শহীদ পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে তিনি ১৯৮১ সালে তার অবস্থার স্মৃতি রোমন্থন করছেন। মাননীয় বিরোধী দলের নেত্রী, তাই আপনার কাছে একটি বিনীত প্রস্তাব রাখতে চাই। আপনি বাংলাদেশে একজন জননন্দিত নেত্রী। যে দেশের ৬২ শতাংশ মানুষ ভূমিহীন, সে দেশে দুটি প্রাসাদোপম বাড়ি রাষ্ট্রের কাছ থেকে গ্রহণ কি আপনার করা উচিত?’
খবরটি শেয়ার করুন