শুক্রবার, ৩০শে জানুয়ারী ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৬ই মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ‘একাত্তরের গণহত্যাও কি ধর্মের লেবাস চড়িয়েই চালানো হয়নি?’ *** নির্বাচন সামনে রেখে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার সুরক্ষার অঙ্গীকার চায় সিপিজে *** টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ৯০ ক্রিকেটার ‘চরম ঝুঁকিপূর্ণ’ *** ‘তারেক রহমান মনোনীত ৩০০ গডফাদারকে না বলুন, বাংলাদেশ মুক্তি পাবে’ *** সরকারি কর্মচারীদের গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’–এর পক্ষে প্রচার দণ্ডনীয়: ইসি *** যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের টানাপোড়েনে মধ্যস্থতা করতে চায় তুরস্ক *** ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডকে ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করছে ইইউ *** হাজিরা পরোয়ানাকে ‘জামিননামা ভেবে’ হত্যা মামলার ৩ আসামিকে ছেড়ে দিল কারা কর্তৃপক্ষ *** আওয়ামী ভোটব্যাংক: জয়-পরাজয়ের অদৃশ্য সমীকরণ *** ‘সজীব ওয়াজেদ জয়ের যুক্তি অযৌক্তিক নয়’

‘একাত্তরের গণহত্যাও কি ধর্মের লেবাস চড়িয়েই চালানো হয়নি?’

নিজস্ব প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ১০:১০ অপরাহ্ন, ২৯শে জানুয়ারী ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কলামিস্ট হাসান ফেরদৌস বলছেন, আজকের বাংলাদেশে ইসলাম ধর্মকে আশ্রয় করে যারা রাজনীতি করেন, তাদের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা গেলে ধর্মের নামে সবার আগে আরো কঠোর অভিঘাত নেমে আসতে পারে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর। তার আশঙ্কা, মৌলবাদী গোষ্ঠী ক্ষমতায় গেলে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের উপর হামলাসহ যখন-তখন শিয়া মসজিদে পাকিস্তানের মতো বোমাবাজির ঘটনা ঘটতে পারে। দেশের সংগীত-নাট্যচর্চায় আঘাত আসাসহ নারীর অগ্রগতিতে বাধা আসতে পারে আফগানিস্তানের মতো।

পাকিস্তান আমলে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আবুল আলা মওদুদির ফতোয়ায় ১৯৪৮ সালে আহমেদিয়াবিরোধী দাঙ্গায় দেশ ক্ষত-বিভক্ত হয় এবং ধর্মের নামে দাঙ্গা বাধালেও এর মূল লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, পাকিস্তানে ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের একটি প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা তৈরি হয়। তার প্রশ্ন, একাত্তরের গণহত্যাও কি ধর্মের লেবাস চড়িয়েই চালানো হয়নি? সমস্যা ধর্মে নয়, সমস্যা বাধে যখন সেই ধর্মের একমাত্র প্রবক্তার দাবি নিয়ে কেউ মাঠে নেমে পড়েন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে ক্ষমতায় যাওয়ার লক্ষ্যে ধর্মের ব্যবহার তীব্রতর হয়ে উঠছে। একাধিক দল রয়েছে, যাদের নামের সঙ্গে ধর্মের নাম জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে কারও কোনো সন্দেহ না থাকে তারা আসলে কে। দেশে যখন নির্বাচনের প্রচারণা চলছে, তখন কিছু গোষ্ঠী প্রকাশ্যেই বলছে যে তাদের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া মানে আল্লাহর শাসনের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া। আগেও আমরা দেখেছি, রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা হারালেই এসব গোষ্ঠী প্রতিপক্ষকে ধর্মবিরোধী আখ্যা দেয়।

তিনি বলেন, ধর্ম নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই আমরা পেশাদার মাওলানা, বা ধর্মীয় ব্যক্তিদের জন্য জায়গা ছেড়ে দিই, তারাই ঠিক-বেঠিকের ফয়সালা করেন। এই কর্তৃত্ব আমরাই দিয়েছি। চাইলে আমরাই তা ফিরিয়েও নিতে পারি। ধর্মের নামে একতরফাভাবে ‘ফতোয়া’ দেওয়ার অধিকার একটি বিশেষ গোষ্ঠীর হাতে ছেড়ে দেওয়া বোকামি। আমাদের মধ্যেও এমন লোক চাই, যিনি ধর্মের বিষয়ে যোগ্যতার সঙ্গে কথা বলবেন, অন্যায্য কথার প্রতিবাদ করবেন।

ধর্মকে আশ্রয় করে রাজনীতি করা গোষ্ঠীগুলো জনসমক্ষে নারীর উপস্থিতিকে ভালো চোখে দেখে না উল্লেখ করে হাসান ফেরদৌস বলেন, সেই ভীতি থেকেই কেবল ফতোয়া নয়, আইন করেও নারীদের গৃহবন্দী করে রাখার প্রবণতা দেখা যায়। তালেবান শাসনের অধীন আফগানিস্তানের দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। সেখানে বারো বছর বয়স পেরোনোর পর মেয়েদের জন্য স্কুলের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। দেশে একটা দল (জামায়াত) নারীদের কর্মঘণ্টা কমিয়ে পাঁচ ঘণ্টা করার কথা বলেছে। এটাও নারীকে শ্রমবাজারের প্রতিযোগিতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে গৃহবন্দী করার এক দীর্ঘমেয়াদি কৌশল।

তিনি বলেন, প্রাচীন মিসর থেকে শুরু করে গত শতকের পাকিস্তান কিংবা আজকের যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ধর্মকে এমন এক মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠী তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতার দখলকে বৈধ বা ঈশ্বরসম্মত বলে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে। এর পরিণতি প্রায় সর্বত্রই একই রকম। যখনই ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির উপকরণে রূপান্তর করা হয়েছে, তখনই মানুষের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা সংকুচিত হয়েছে, সমাজে ভীতি ও সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে এবং গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদ গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাষ্ট্র যখন ধর্মকে নিজের হাতিয়ার বানায়, তখন গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বিশ্বাস কলুষিত হয়।

দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক উপসম্পাদকীয়তে প্রবাসী সাংবাদিক, লেখক ও প্রাবন্ধিক হাসান ফেরদৌস এসব কথা বলেন। তার লেখাটি আজ বৃহস্পতিবার (২৯শে জানুয়ারি) পত্রিকাটির ছাপা সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে 'সমস্যা ধর্মে নয়, ধর্মের নামে রাজনীতিতে' শিরোনামে। তিনি প্রথম আলোর নিয়মিত কলাম লেখক।

হাসান ফেরদৌস উপসম্পাদকীয়তে বলেন, বস্তুত ধর্ম কোথাও কখনো মানুষের অধিকার ছিনিয়ে নেয় না, তাদের ওপর বৈষম্য আরোপ করে না। এটি হলো তাদের কাজ, যারা ধর্মকে নিজের রাজনৈতিক ও জাগতিক নিয়ন্ত্রণ অর্জনে ব্যবহার করতে চায়। মত ও পথের অমিল হলেই ধর্মের আবরণ চাপিয়ে দমনমূলক আচরণকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

তিনি বলেন, পৃথিবীর কোনো ধর্মই নারীদের ঘরে বন্দী করে রাখার নির্দেশ দেয় না কিংবা ঘরে থাকার বিনিময়ে সুবিধার কথা বলে না। ইন্দোনেশিয়া থেকে তিউনিসিয়া পর্যন্ত এবং তুরস্ক থেকে জর্ডান পর্যন্ত বিশ্বের অধিকাংশ মুসলিমপ্রধান দেশেই নারীদের শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেখানে নারী ও পুরুষ পড়াশোনা, অফিস-আদালতসহ একসঙ্গে করছে।

মৌলবাদীদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসা মোকাবিলা করতে সবাইকে উচ্চ স্বরে প্রতিবাদ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যাতে রাজনীতিতে ধর্মের অপব্যবহারকারী এই গোষ্ঠীর কথা চাপা পড়ে যায়। ধর্মকে আশ্রয় করে ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা আরও সোজাসাপ্টা ভাষায় বললে ধর্মকে পুঁজি করে রাজনীতি করা কোনো নতুন ঘটনা নয়। দেশে ফেসবুকে কে কোথায় কী লিখেছে, অথবা কী মন্তব্য করেছে, সত্য-মিথ্যা বিচার ছাড়াই উগ্রবাদী গোষ্ঠী সংখ্যালঘুদের ওপর চড়াও হওয়ার ঘটনা আকসার হচ্ছে।

হাসান ফেরদৌস লেখেন, প্রশ্ন হলো, রাজনীতিতে ধর্মের অপব্যবহার কীভাবে মোকাবিলা করা যাবে। উত্তরটি আসলে খুবই সরল। আমরা যদি না চাই, তাহলে ধর্মকে সামনে রেখে যারা রাজনীতি করতে ও জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চায়, তাদের পক্ষে আমাদের চাবুক দেখিয়ে শাসন করা সম্ভব হবে না। এর জন্য প্রয়োজন নারী ও পুরুষের সম্মিলিত ধারাবাহিক প্রতিবাদ ও বিরোধিতা।

তিনি বলেন, প্রতিবাদ যে কার্যকর হতে পারে, তার উদাহরণ আমাদের সামনেই আছে। গত বছর জয়পুরহাটে ধর্মীয় যুক্তি দেখিয়ে মেয়েদের ফুটবল খেলা বাতিল করা হয়েছিল এবং ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছিল। কিন্তু তীব্র সামাজিক প্রতিবাদের মুখে শেষ পর্যন্ত সেই খেলা অনুষ্ঠিত হয়, আর যারা আপত্তি তুলেছিল, তারা ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয়। একইভাবে নারায়ণগঞ্জে হাজারো দর্শকের উপস্থিতিতে লালন মেলা বসেছে।

তিনি বলেন, এসব ঘটনা দেখায়, সম্মিলিত ও দৃঢ় প্রতিবাদ কেবল প্রতিরোধই গড়ে তোলে না, বরং সমাজকে তার বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক শক্তির কথাও নতুন করে মনে করিয়ে দেয়।

তার মতে, এই মুহূর্তে এক জটিল সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ। এটিকে যদি ধর্মের রাজনীতিকরণের বিরুদ্ধে জয়ী হতে হয়, তাহলে সমস্বরে প্রতিবাদ জানাতেই হবে। আমরা দেখেছি, রাজনীতিবিদেরা ডান-বাম কি মাঝখানের সবাই নিজের ক্ষমতা দখলের বৈধতার জন্য ধর্মের ঘাড়ে ভর করে। এটা মোকাবিলার একটাই পথ, উচ্চ স্বরে এমন প্রতিবাদ করা, যাতে রাজনীতিতে ধর্মের অপব্যবহারকারী এই গোষ্ঠীর কথা যেন চাপা পড়ে যায়।

হাসান ফেরদৌস

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250