ফাইল ছবি
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের মিলিয়ে অন্তত ২৯৬ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যা চেষ্টা ও গোলাগুলির ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে মামলা দায়ের হয়েছে। ১৮ সাংবাদিক এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছেন, কয়েকজন জামিন পেয়েছেন। তবে এসব মামলার বিচারিক কার্যক্রম ঠিকমতো পরিচালিত হচ্ছে না বলে অভিযোগ সাংবাদিক সমাজের।
অভিজ্ঞ সাংবাদিকেরা বলছেন, সাংবাদিকের বিরুদ্ধে এমন ফৌজদারি মামলা করা হয়েছে—যার অনেকগুলোই হত্যার অভিযোগে—যেসব মামলায় তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে তদন্তই হয়নি, কিংবা আজ পর্যন্ত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এতো মামলা দায়েরের ‘রেকর্ড’ এবং গত প্রায় ১৬ মাসেও সেগুলোর তদন্তের অগ্রগতি না হওয়ার দায় আইন মন্ত্রণালয় ও এর দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল এবং স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী ও তার মন্ত্রণালয়ের বলে তাদের অভিমত।
তাদের মতে, উপদেষ্টাদের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টনের দিকে তাকালে বর্তমান সরকারের ‘বিশৃঙ্খলার চিত্র’ স্পষ্ট হয়। আইন এবং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় একই জনের কাঁধে ন্যস্ত হওয়ার ফল হচ্ছে দেশে সাংবাদিকেরা হত্যা মামলার আসামি হচ্ছেন এবং আইনি ব্যবস্থা পরিণত হয়েছে নাগরিকদের হয়রানি, ভয় দেখানো ও অর্থ আদায়ের অস্ত্রে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক্ষেত্রে তৎপরতা নেই।
অনেকে মনে করেন, বিষয়টির দায় শুধু আইন বা স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার কাঁধে ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না। কারণ, এটি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন পুরো উপদেষ্টা পরিষদের সম্মিলিত অবস্থান। এর দায় অন্তর্বর্তী সরকারের।
এদিকে, কমিটির দায়িত্ব হবে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা পর্যবেক্ষণ করা ও সময়ে সময়ে মামলার বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা, এমন আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতির মধ্য দিয়ে মামলা পর্যবেক্ষণে আট সদস্যের ‘গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা পর্যবেক্ষণ–সংক্রান্ত কমিটি’ গঠিত হয়েছিল। ২০২৪ সালের ৭ই অক্টোবর তথ্য মন্ত্রণালয় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া হয়রানিমূলক মামলার পুনর্মূল্যায়নের জন্য এ কমিটি গঠন করে।
এরপর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ১লা জুলাইয়ের পর দায়ের হওয়া মামলার বিস্তারিত ও প্রমাণাদি জমা দিতে বলা হয়, ব্যক্তিগতভাবে বা সম্পাদকদের মাধ্যমে। জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক সরকারের গঠিত কমিটির আসল দায়িত্ব কী, বিষয়টি অনেক সাংবাদিকের কাছে এখনো স্পষ্ট নয়।
কমিটির কোনো কাজও তাদের কাছে সেভাবে দৃশ্যমান নয়। কমিটি গঠনের পর প্রায় ১৪ মাসের মধ্যেও এর মাধ্যমে মামলার শিকার ও কারাবন্দী সাংবাদিকদের উপকৃত হওয়ার তথ্য খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কমিটি এতোদিনে পেয়েছে মাত্র ৭২ সাংবাদিকের নাম। অনেক সাংবাদিক হয়রানিমূলক মামলার শিকার হলেও কমিটি তাদের খবর পায়নি। এই কমিটির পাঠানো ৭২ জনের তালিকাও আটকে আছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে।
প্রাথমিক তদন্তে প্রমাণ না পাওয়া গেলে কোনো মামলা থেকে অভিযুক্তের নাম বাদ দেওয়ার ক্ষমতা চলতি বছর অধ্যাদেশ জারি করে দেওয়া হয়েছে পুলিশকে। এখন পর্যন্ত কোনো সাংবাদিক এই সুবিধা পাননি। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে সাংবাদিকদের হত্যা মামলায় অভিযুক্ত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানে রয়েছে।
মামলার শিকার কোনো কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে গত সরকারের আমলে অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা নেওয়া ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের হওয়া নিয়ে শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন আছে।
সাংবাদিক সমাজের একাংশ বলছে, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এসব মামলা হয়তো সরাসরি সরকারের নয়, বরং রাজনৈতিক দল বা অন্য রাজনৈতিক চরিত্রের সহায়তায় দায়ের করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে একাধিকবার বলা হয়েছে, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সরকারের কেউ মামলা দায়ের করেননি।
সাংবাদিক সমাজের আরেক অংশ বলছে, যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ও কারাগারে আছেন, তারা আওয়ামী লীগের গত সরকারের শাসনামলে নানাভাবে সরকারের সঙ্গে যুক্ত এবং সুবিধাভোগী ছিলেন।
এ অংশের মতে, কারাবন্দী ও মামলার শিকার সাংবাদিকেরা অনৈতিক সুবিধা নিয়েছেন। গত সরকারের বিরোধী দল দমন, সংসদ নির্বাচনে জালিয়াতি, গুম, সংবাদমাধ্যমকে চুপ করিয়ে রাখা ও রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে অন্যায়ভাবে মানুষকে আটক রাখার কর্মকাণ্ডে এসব সাংবাদিক রাজনৈতিক আনুগত্য দেখিয়েছেন।
কর্তৃত্ববাদী শাসনের কট্টর সমর্থক বা প্রচারক ছিলেন তারা। গত বছরের জুলাই-আগস্টে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা চালানোর আহ্বান জানিয়েছেন বা এতে সমর্থন করেছেন তারা। সাংবাদিক সমাজের এ অংশ চায়, মামলাগুলোর তদন্ত দ্রুত হওয়ার পাশাপাশি অভিযুক্তদের যেন যথাযথ সাজা হয়।
সম্পাদক পরিষদ বলছে, যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করে অভিযুক্ত সাংবাদিকদের কোনো সংশ্লিষ্টতা না পাওয়া গেলে এসব মামলা থেকে দ্রুত তাদের অব্যাহতি দেওয়া উচিত। সাংবাদিকেরা অপরাধ করে থাকলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে যথাযথ ধারা অনুসরণ করে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
পরিষদের পরামর্শ, যে সাংবাদিকেরা গত সরকারের নানা নিপীড়নমূলক কর্মকাণ্ডে সাংবাদিকতার নামে সমর্থন দিয়েছেন, প্রেস কাউন্সিলে কমিটি গঠন করে দোষী সাব্যস্ত হলে কাউন্সিলের আইনে তাদের সাজা হতে পারে। কাউন্সিলের সুপারিশের ভিত্তিতে প্রচলিত আইনে তাদের বিচার চলতে পারে।
অনেক সাংবাদিক দীর্ঘদিন ধরে প্রমাণ ছাড়া আটক রয়েছেন। এ ধরনের আটক ও জামিন না পাওয়ায় বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও সরকারের সংস্কার প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পুলিশ মামলা নেওয়ার বা গ্রেপ্তারের আগে কোনো ধরনের তদন্তের চেষ্টা পর্যন্ত করেনি।
আবার পুলিশ ১৬ মাসের মধ্যেও আদালতে এমন কোনো নতুন প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি, যা এ নির্দিষ্ট অভিযোগগুলোর সঙ্গে সাংবাদিকদের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ করে। প্রশ্ন উঠেছে, এর দায় কার? দায় আইন উপদেষ্টার কাঁধে বর্তাতে চান অনেকে।
ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, ‘সাংবাদিকেরা যদি অপরাধ করে থাকেন, তাহলে অবশ্যই তাদের বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু আজকে এতাদিন ধরে কারাগারে, তারা জামিন পাচ্ছেন না। তাদের কোনো আইনি প্রক্রিয়া চলছে না। বিচার হচ্ছে না। তাহলে এটা কী চলতে থাকবে!’
তিনি বলেন, ‘কারো যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন না তুলে বরং উপদেষ্টাদের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টনের দিকে তাকালেই বর্তমান বিশৃঙ্খলার একটি চিত্র স্পষ্ট হয়। আমরা আইন এবং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ন্যস্ত করেছি এমন একজনের কাঁধে, এর ফলাফল, আমাদের দেশে সাংবাদিকেরা হত্যা মামলার আসামি হচ্ছেন এবং আইনি ব্যবস্থা পরিণত হয়েছে নাগরিকদের হয়রানি, ভয় দেখানো ও অর্থ আদায়ের অস্ত্রে।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'আমরা একই ব্যক্তির কাছে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং এর পাশাপাশি কৃষি মন্ত্রণালয় দিয়েছি। তার পক্ষে কি এটা সম্ভব? স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অত্যন্ত জটিল এবং ২৪ ঘণ্টার দায়িত্ব নয় কি? কৃষির জন্য ভাবার সময় কখন তার? অথচ আমাদের বেঁচে থাকার তিনটি স্তম্ভ হলো—কৃষি, পোশাক খাত ও রেমিট্যান্স।'
সাংবাদিকেরা এসব মামলায় পড়েছেন আর একটি কদম এগোয়নি মামলার তদন্তের ব্যাপারে উল্লেখ করে মাহফুজ আনাম বলেন, ‘আইন উপদেষ্টা বলছেন, আমাদের কিছু করার নেই, জনগণের অধিকার আছে মামলা করার। মেনে নিলাম মামলা করা অধিকার; কিন্তু কোনো আইনের যদি অপপ্রয়োগ হয়, তাহলে কী সরকার কিছু করবে না?’
মাহফুজ আনাম বলেন, আমাদের প্রশ্ন হলো, যেখানে আইন অপব্যবহারের বিষয়টি স্পষ্ট, সেখানেও কি সরকার বাধা দিতে পারে না? আমাদের বিশ্বাস, কর্তৃপক্ষ চাইলে সহজেই তদন্ত করে দেখতে পারত যে, এই মামলাগুলোর অধিকাংশই প্রমাণ করা প্রায় অসম্ভব। কিছু সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দলীয় সাংবাদিকতা বা এমনকি দুর্নীতির অভিযোগ থাকতে পারে এবং এর জন্য তাদের উপযুক্ত আইনে বিচার ও শাস্তি দেওয়া সম্ভব। কিন্তু তাই বলে তাদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দিতে হবে?
তিনি বলেন, সরকার যদি এই নীতি গ্রহণ করত যে, ভুয়া মামলা করা অপরাধ এবং যারা এই অধিকারের অপব্যবহার করেছে তাদের শাস্তি দিত, তাহলে হয়রানি ও চাঁদাবাজির এই দ্বার খুলতো না এবং আইনের এতটা লজ্জাজনক, ইচ্ছাকৃত ও পরিকল্পিত অপব্যবহার হতো না।
ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান মনে করেন, কারাবন্দী সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনার যথেষ্ট যুক্তিসংগত কারণ অবশ্যই থাকতে পারে। কয়েক সাংবাদিক ২০২৪ সালের ২৩শে জুলাই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে এডিটরস গিল্ডের এক বৈঠকে আন্দোলনকারীদের নিয়ে উসকানিমূলক মন্তব্য করেন। এ ধরনের বক্তব্যের কিছু অংশ ধাক্কা খাওয়ার মতো। তবে রাজনৈতিক আনুগত্য কিংবা কোনো কর্তৃত্ববাদী শাসনের কট্টর সমর্থক বা প্রচারক হওয়াটাই অপরাধ নয়।
তিনি বলেন, এ অবস্থানের ভার যদি শুধু আইন উপদেষ্টার কাঁধে ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে তা সহজ হবে না; বরং এটি পুরো ইউনূস মন্ত্রিসভার একটি সম্মিলিত অবস্থান। এখানে যারা নিজেদের গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের পক্ষে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে দাবি করেন, তাদের সবারই স্পষ্ট ও প্রকাশ্যে এ বিষয়ে মুখ খুলতে হবে। তাদের বলতে হবে—বিচার প্রতিশোধ নয় এবং সাংবিধানিক গণতন্ত্রে বিচারবহির্ভূতভাবে আটক রাখার কোনো স্থান নেই।
বার্গম্যান বলেন, ‘গ্রেপ্তারের ঘটনার অনেকগুলোই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এফআইআরের মাধ্যমে শুরু হয়েছে। এগুলো হয়তো সরাসরি সরকারের নয়, বরং রাজনৈতিক দল বা অন্য রাজনৈতিক চরিত্রের সহায়তায় দায়ের করা হয়েছে। কিন্তু এসব অপব্যবহারে হস্তক্ষেপ করে সেগুলো সংশোধন করতে সরকারের ব্যর্থতা অগ্রহণযোগ্য।’
প্রসঙ্গত, ডেইলি স্টারের তৈরি করা মামলার শিকার ২৯৬ জনের তালিকার সাংবাদিকদের প্রায় ২০ শতাংশের গত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক ছিল—যাদের কেউ কেউ দলটির প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন, কেউ কেউ ছিলেন সংগঠনের পদে, সরকারের অনৈতিক সুবিধাও নিয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও আছে।
তাদের মধ্যে রয়েছেন নারায়ণগঞ্জের কমল খান ও রাজু আহমেদ। তারা সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ। একজনকে শামীম ওসমানের সশস্ত্র গ্রুপের সঙ্গে দুটি বন্দুক নিয়ে গুলি করতেও দেখা গেছে। অন্যান্যদের মধ্যে আছেন নাঈমুল ইসলাম খান, যিনি ছিলেন শেখ হাসিনার প্রেস সচিব।
খবরটি শেয়ার করুন