ফাইল ছবি (সংগৃহীত)
বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং তার ভারতে যাওয়ার পর থেকে গত এক বছরে মোহাম্মদ এ আরাফাত কোনো নতুন বা পুরোনো শখের পেছনে ছোটার ফুরসত পাননি। তাকে ব্যস্ত রাখছে দলীয় কাজ এবং ইউনূস সরকারকে উৎখাত করে হাসিনাকে দেশে ফেরানোর স্বপ্ন। তার দাবি, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারটি ‘অবৈধ’।
বাংলাদেশের এই সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী টেলিফোনে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্টকে বলেন, ‘হাসিনা চলে যাওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ এক অতল খাদের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। আমার একটাই লক্ষ্য: বাংলাদেশে আবার সবকিছু ঠিক করা। এখন আমার সত্যিই কোনো শখ নেই, কোনো খেলাধূলার সময় নেই, অথবা অন্য কোনো বিনোদনে গা ভাসানোর অবকাশ নেই।’
আরাফাতের জন্য কাজ মানে হলো, বাংলাদেশে রাজনৈতিক কর্মসূচির পরিকল্পনা করা এবং নির্বাসনে থাকা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা ও তৃণমূল কর্মীদের সঙ্গে প্রতিদিন যোগাযোগ রাখা। হাসিনার পথ ধরে আওয়ামী লীগের যেসব জ্যেষ্ঠ নেতা ভারতে চলে গেছেন, তাদের একজন আরাফাত। খবর দ্য প্রিন্টের।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে গত বছর ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয় এবং হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে চলে আসতে বাধ্য হন। গত এক বছরে সাবেক মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ, দলটির যুবসংগঠন যুবলীগ আর ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের শীর্ষ ও মধ্যপর্যায়ের ১ হাজার ৩০০-এর মতো নেতা-কর্মী ভারত ও বিশ্বের অন্যান্য জায়গায় নির্বাসনে আছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির এক সাবেক সদস্য বলেছেন, শুধু আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীরাই নির্বাসনে গেছেন, তেমনটা নয়। তাদের সঙ্গে সাংবাদিক, নাগরিক সমাজের অধিকারকর্মী, সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তা ও কূটনীতিকেরাও যোগ দিয়েছেন। ‘মুহাম্মদ ইউনূস প্রশাসনের প্রতিহিংসামূলক অভিযানের কারণে’ তারা বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।
আওয়ামী লীগের ওই নেতা বলেন, ‘আপনি যদি গোনেন, তবে এই সংখ্যা দু হাজার ছাড়িয়ে যাবে।’ যারা ভারতে আছেন, তাদের বেশির ভাগই আছেন কলকাতার নিউটাউনে। এটি কলকাতার প্রান্তে দ্রুত বাড়তে থাকা একটি পরিকল্পিত উপশহর। চওড়া রাস্তা, সাধ্যের মধ্যে ভাড়ায় অ্যাপার্টমেন্ট, বিপণিকেন্দ্র, ফিটনেস সেন্টার এবং নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি অবস্থান নিউটাউনকে দেশছাড়া ব্যক্তিদের বসবাসের আদর্শ কেন্দ্রে পরিণত করেছে।
বাংলাদেশে ফেলে যাওয়া পরিবারের সদস্যদের থেকে দূরে এই সব ব্যক্তির জীবন একটি ছকে পড়ে গেছে: ফজরের নামাজ পড়া, জিমে যাওয়া বা সকালে হাঁটা, প্রতি সন্ধ্যায় বাংলাদেশ ও বিশ্বের অন্যান্য স্থানে থাকা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে অনলাইন বৈঠক এবং প্রত্যাবর্তনের আশায় থাকা।
দেশছাড়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, যাকে গত অক্টোবরে ওই এলাকায় দেখা গিয়েছিল।
২০২৪ সালের ২রা অক্টোবর বাংলাদেশে একটি খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। সেখানকার সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে কলকাতার বিখ্যাত বিনোদন পার্ক নিক্কো পার্কে দেখা গেছে। কেউ কামালকে দেশ ছাড়তে দেখেননি। তিনি কীভাবে ঢাকা থেকে অদৃশ্য হয়ে কলকাতায় উপস্থিত হলেন, এটা জনগণকে বোঝাতে ঢাকার বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়।
তত দিনে ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সংঘটিত কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের মামলায় আসাদুজ্জামান খানের নাম এসেছে। শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকারের যে কয়েকজন মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যের অবস্থানের হদিস জানা যায়নি, তাদের একজন সাবেক এ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
বাংলাদেশে সে সময় পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ভারপ্রাপ্ত) শাহ আলম স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘আমরা বিষয়টি তদন্ত করে দেখছি। যদি তারা ইমিগ্রেশন পার হয়ে যেতেন, তবে আমাদের কাছে প্রমাণ থাকত। তাদের ক্ষেত্রে কোনো প্রমাণ নেই… অনেকে [আওয়ামী লীগের মন্ত্রী ও নেতা] অবৈধভাবে দেশ ত্যাগ করেছেন। কেউ কেউ এখনো দেশে আছেন এবং অনেককে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো গ্রেপ্তার করেছে।’
নিউটাউনে বসবাস করা আওয়ামী লীগের এক সাবেক সংসদ সদস্য দ্য প্রিন্টকে বলেন, তিনি নিয়মিত আসাদুজ্জামান খানের সঙ্গে দেখা করেন। এই সাবেক সংসদ সদস্যের ভাষ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এখন ওই এলাকায় একটি বড় অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়েছেন, যেখানে নিয়মিত তার দলের সহকর্মী ও নিউটাউনের বর্তমান প্রতিবেশীরা আসেন। তিনি অতিথি আপ্যায়ন করেন।
আসাদুজ্জামান খান কলকাতায় তার স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে থাকেন। দলীয় বৈঠকের জন্য তিনি প্রতি সপ্তাহে দিল্লিতে যান। তিনি সেখানে ভারতের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও দেখা করেন। তার ছেলে শাফি মুদ্দাসির খান (জ্যোতি) গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকায় গ্রেপ্তার হন। সাবেক ওই সংসদ সদস্য আরও বলেন, আসাদুজ্জামান খানকে দলের নেতা ও কর্মীদের মনোবল ঠিক রাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই সাবেক সংসদ সদস্য বলেন, আসাদুজ্জামান খান তার অ্যাপার্টমেন্টে আসা দলীয় সহকর্মীদের রোজ বার্তা দেন, ‘আমরা এখানে বিশ্রাম নিতে বা স্থায়ীভাবে থাকতে আসিনি। আমরা এখানে বেঁচে থাকার জন্য এসেছি এবং আগামী লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হতে এসেছি।’
আসাদুজ্জামান খানকে প্রতি সপ্তাহে দিল্লি ভ্রমণ এবং কলকাতায় প্রতিদিনের বৈঠক নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়। আওয়ামী লীগের অন্য নেতারা গত বছরের আগস্টের তুলনায় এখন শ্বাস ফেলার অবকাশ পাচ্ছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের কক্সবাজারের সাবেক সংসদ সদস্য বলেন, এখন জীবন একটি নির্দিষ্ট ছকে পড়ে গেছে।
এই সাবেক সংসদ সদস্য বলেন, ‘আমি ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠি এবং ঘরেই ফজরের নামাজ পড়ি। আওয়ামী লীগের আরেক সংসদ সদস্যের সঙ্গে আমি একটি থ্রিবিএইচকে [তিন শয়নকক্ষ, হলঘর ও রান্নাঘর] অ্যাপার্টমেন্টে থাকি। নামাজের পর আমরা দুজনই পাশের একটি ফিটনেস স্টুডিওতে যাই, সেটি বেশ ভালো। আমি ভারোত্তোলন করি আর আমার ফ্ল্যাটমেট পিলাটিসের (একধরনের ব্যায়াম) ক্লাস করেন।’
দেড় হাজার বর্গফুটের ওই অ্যাপার্টমেন্টের ভাড়া মাসে ৩০ হাজার রুপি। ওই সাবেক সংসদ সদস্যের কাছে ভাড়াটা খুব বেশি মনে হয় না। তবে তাদের মৃদু বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, রান্নার লোক ও ঘরবাড়ি পরিষ্কার করার লোকেদের বিনা নোটিশে কাজে না আসা।
ওই সাবেক সংসদ সদস্য হালকা সুরে বলেন, ‘আমার রান্না করার অভ্যাস নেই। আমার ফ্ল্যাটমেটেরও একই অবস্থা। তাই যেসব দিনে আমরা রান্না করতে বাধ্য হই, সেসব দিনে আমি ঢাকায় থাকা আমার স্ত্রীকে ভিডিও কল করি। তিনি বিস্তারিত নির্দেশনা দেন। এটা আমার জন্য নতুন। যখন আমি বাংলাদেশে বাড়িতে ফিরে যাব, কে জানে আমি হয়তো শেফ হিসেবে নতুন পেশাজীবন শুরু করতে পারব।’
খবরটি শেয়ার করুন