অনলাইনে গণমাধ্যমের নাম ও লোগো নকল করে একের পর এক ফেসবুক পেজ খোলা এখন শুধু ঠাট্টা বা ‘মজা’ নয়, বরং তা হয়ে উঠেছে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে বিভ্রান্তি তৈরির এক বিপজ্জনক হাতিয়ার। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণ কিংবা প্রতিষ্ঠানবিরোধী মনোভাব থেকে এ ধরনের কৃত্রিম পেজ ব্যবহার করে জনসচেতনতা এবং গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা—দুইয়েরই ক্ষতি করা হচ্ছে। এসব পেজ থেকে আসল ও নকলের ফারাক না বুঝে অনেকেই বিভ্রান্ত হচ্ছেন, যা গণমাধ্যম ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংবাদপত্র বা টেলিভিশন চ্যানেলের লোগো, ডিজাইন এমনকি ভাষাশৈলী নকল করে তৈরি করা এসব পেজ কেবল অপপ্রচার চালায় না, বরং সমাজে ভুল তথ্যের ভিত্তিতে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। এর ফলে সাধারণ মানুষ যেমন প্রতারিত হচ্ছেন, তেমনি আসল গণমাধ্যমগুলোর ভাবমূর্তি নিয়েও সন্দেহ তৈরি হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে যখন খবরের গতির ওপর নির্ভর করে জনমত, তখন ভুয়া পেজের মাধ্যমে ছড়ানো বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট এক ধরনের ‘তথ্যভিত্তিক সন্ত্রাস’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নকল লোগো, নকল খবর
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সাইফুল আলম চৌধুরী বলেন, ‘টিভি বা পত্রিকাকে নকল করে যেসব পেজ তৈরি হচ্ছে, এগুলোর বাস্তব অস্তিত্ব নেই। একে ঠাট্টার ছলে শুরু করা হলেও এখন এটা ব্যাপক অপতথ্যের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। কপিরাইট সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় নীতিমালা জরুরি। একটা পেজ বন্ধ করলে আরেকটা খোলা হয়—এভাবে চলতে থাকলে সমাধান হবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা নির্বাচনপূর্ব সময়ে সারা বিশ্বেই এ ধরনের ট্রেন্ড দেখা যায়। উদ্দেশ্য থাকে জনমত প্রভাবিত করা। যারা এগুলো তৈরি করছে, তারা জানে—মানুষের বড় একটি অংশ প্রযুক্তি-সচেতন নয়। ফলে দৃষ্টিনন্দন লোগো, পরিচিত টেমপ্লেট বা ‘ফটোকার্ড’ দেখে সাধারণ মানুষ সেটাকে আসল সংবাদমাধ্যম ভেবে ভুল করে।’
সমাধানের পথ কী? ড. সাইফুল আলম বলেন, ‘মিডিয়া লিটারেসি বাড়াতে হবে। তথ্য যাচাই কীভাবে করতে হয়, মানুষকে সেটা শেখাতে হবে। এখন তথ্যের অধিকারও একটি মৌলিক অধিকার, তাই মানুষকে যেমন খাবারের ভেজাল সম্পর্কে সচেতন করা হয়েছে, তেমনি তথ্যের ভেজাল সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।’
দ্রুত ফলোয়ার, দ্রুত বিভ্রান্তি
সম্প্রতি ফেসবুকে যমুনা টিভির লোগো নকল করে তৈরি হওয়া Anwar TV নামের একটি পেজ মাত্র তিন মাসে পেয়েছে ২ লাখ ৩৮ হাজার ফলোয়ার। পেজটির বিবরণে লেখা আছে ‘শুধু বিনোদনের উদ্দেশ্যে’—তবু অনেকেই তা বুঝতে পারছেন না। কারণ পেজ থেকে তৈরি ফটোকার্ড ও শেয়ার করা কনটেন্ট আসল সংবাদমাধ্যমের মতোই পেশাদারভাবে তৈরি, যা সাধারণ পাঠকের বিভ্রান্তি আরও বাড়িয়ে দেয়।
তেমনই আরেকটি পেজ হলো The Delhi Star, যা ইংরেজি দৈনিক The Daily Star–কে নকল করে তৈরি। পেজটির এক ভিডিওতে ‘ঢাবি ক্যাম্পাসে র কিংবা আইএসআই এজেন্ট অনুপ্রবেশ করেছে’—এমন দাবি করে ১৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ছাড়া হয়। ভিডিওটি দেখা হয় ১১ লাখ বার। অনেকে সেটিকে সত্যি ভেবে The Daily Star–কেই গালিগালাজ করতে থাকেন। অথচ এটি একটি মিথ্যা ভিডিও এবং নকল পেজ।
একইভাবে মানবজমিন পত্রিকাকে নকল করে তৈরি হয়েছে মনিরজমিন নামের একটি পেজ। ১৩ই আগস্ট খোলা এই পেজেও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল ও নেতিবাচক পোস্ট করা হয়েছে, যার ভাষা ও গ্রাফিক্স দেখে আসল সংবাদমাধ্যম ভেবে বিভ্রান্ত হচ্ছেন অনেকেই। এ ছাড়া সম্প্রতি যেসব ভুয়া নামের পেজ আলোচনায় এসেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে, অসময় (সময় টিভির নকল সংস্করণ), প্রথম আলু (প্রথম আলো’র নকল সংস্করণ), বালের কণ্ঠ (কালের কণ্ঠ’র নকল সংস্করণ), Channel নাই (চ্যানেল আই’র নকল সংস্করণ), Jerin TV, Jawra TV, Janwar TV (সবগুলোর লোগো যমুনা টিভির আদলে)।
বিশ্বাসের জায়গায় আঘাত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. বি এম মইনুল হোসেন বলেন, ‘এটা শুধু ভুয়া পেজের বিষয় নয়, বরং অন্যের ডিজাইন, লোগো ব্যবহার করে বিজনেস রেপুটেশন নষ্ট করার একটি মারাত্মক প্রবণতা। নিখুঁতভাবে নকল হওয়া এসব পেজে বিভ্রান্ত হওয়া স্বাভাবিক। অনেক সময় এগুলো সামাজিক অস্থিরতা বা সংঘর্ষেও রূপ নেয়।’
তার মতে, ‘সরকারিভাবে মনিটরিং সেল গঠন না করা এবং অপরাধ ইউনিটগুলোর সক্রিয় না থাকা—এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। এখনই যদি এটি প্রতিরোধে ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও খারাপ
সমাধানের পথ কী?
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু ভুয়া পেজ রিপোর্ট করলেই হবে না। স্কুল স্তর থেকে ‘তথ্য সচেতনতা’ শিক্ষার আওতায় আনা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্রিয়তা, এবং ফেসবুক-মেটা-প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে সমন্বয় জরুরি। ভুয়া পেজ থেকে বিভ্রান্তি ছড়ালে শুধু ব্যক্তি নয়, সম্পূর্ণ সমাজ-রাষ্ট্র ঝুঁকিতে পড়ে—এ বিষয়টি বোঝাতে হবে।
গণমাধ্যমগুলোকে নিজেদের ভেরিফায়েড (নীল চিহ্নযুক্ত) পেজ স্পষ্টভাবে প্রচার করা, এবং কনটেন্টে ‘official source’ ট্যাগ ব্যবহার করার পরামর্শও দিয়েছেন অনেকে।
তথ্য সহযোগিতা: দৈনিক খবরের কাগজ।
খবরটি শেয়ার করুন